জেলা ও বিভাগীয় শহরে সিনেমা নির্মাণ
বাংলাদেশের সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। উন্নয়ন, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্যও ঢাকাকে কেন্দ্র করেই যেন আবর্তিত হয়ে এসেছে। তবে সবচেয়ে বেশি ঢাকামুখী সিনেমা, নাটক ও হাল আমলের ওটিটি ইন্ডাস্ট্রি। তরুণরা যারা নির্মাতা কিংবা অভিনয়ের স্বপ্ন দেখে তারা এখনো ঢাকাকে বাদ দিয়ে উন্নতি করার স্বপ্ন দেখতে পারছে না। প্রায় অসম্ভবের এই নজির ভাঙতে শুরু করেছে। ভিন্ন পথে পথ চলা শুরু করেছেন একাধিক তরুণ নির্মাতা ও প্রযোজক। ঢাকার বাইরে গড়ে উঠছে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, আসছে সাউথ বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও। যার শুরু জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরে নতুন নতুন নির্মাণ দিয়ে।
ঢাকার বাইরে ‘দেলুপি’

সবচেয়ে বেশি চমক দেখিয়েছেন রাজশাহীর একঝাঁক তরুণ। দুই সপ্তাহ আগে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে সিনেমা ‘দেলুপি’। তার আগেই মুক্তি পেয়েছিলো রাজশাহীতে। অর্থাৎ ঢাকায় মুক্তি পেয়েছে পরে। সিনেমার শুটিং হয়েছে খুলনায়। এটি পরিচালনা করেছেন মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম। সিনেমার কলাকুশলী ও টিমের অন্য সদস্যরা বেশির ভাগ রাজশাহী ও খুলনার। এই পরিচালক নিজেও বেড়ে উঠেছেন রাজশাহীতে। রাজশাহীতেই গড়ে তুলেছেন তার প্রোডাকশন হাউস ফুটপ্রিন্ট ফিল্ম।
তিনি রাজশাহী থেকে প্রথম নির্মাণ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘কঙ্ক পুরাণ’। ২০২০ সালের দিকে নির্মাণ করেন ‘শাটিকাপ’। রাজশাহীতেই বানিয়েছেন ওয়েব সিরিজ ‘সিনপাট’সহ একাধিক প্রকল্প। তার সব কাজই এখন রাজশাহী কেন্দ্রিক।

খুলনাতেও রয়েছে একাধিক পরিচালক। পরিচালক সুকর্ণ শাহেদ তার মধ্যে অন্যতম। তার শুরুটাও খুলনায়। ২০১৫ সালে খুলনাতেই বানিয়ে ফেলেন প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। খুলনায় এখন তার সোল কিচেন প্রোডাকশন হাউসের অফিস রয়েছে। সেখান থেকে বানিয়েছেন ওয়েব সিরিজ ‘ফেউ’।
এছাড়া ২০২৩ সালে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন সৈয়দা নিগার বানু। ‘নোনাপানি’ সিনেমার শুটিংয়ের জন্য বেছে নেন তারই চেনা লোকেশন ও চরিত্র। খুলনার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে সেই গল্প তুলে ধরেন তিনি। সিনেমার শুটিংও হয় খুলনা অঞ্চলে।

ঢাকার বাইরে গড়ে উঠছে সাউথ বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি
ঠিক ভারতের দক্ষিণী সিনেমার মতোই বাগেরহাট অঞ্চলে সাউথ বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন একদল নির্মাতা। ‘সাহস’ সিনেমা দিয়ে এই যাত্রা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। যার পরিচালনা করেছেন সাজ্জাদ খান। ‘দুঃসাহস’ নামে আরও একটি সিনেমার শুটিংও শেষ হয়েছে। এ সিনেমার পরিচালক কৌতূহল জানান, তারা ইতিমধ্যে লোকবল তৈরির চেষ্টা করছেন। তৈরি করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট লোকজন। কেউ চাইলে শতাধিক শিল্পী ও কলাকুশলী তারা যেকোন মুহুর্তে সরবরাহ করতে পারবেন। এর আগে কমলা রকেট বানিয়ে জনপ্রিয়তা পান নির্মাতা নূর ইমরান মিঠু। তিনিও একটি সিনেমার শুটিং এখানে শেষ করেছেন।

এছাড়া আছেন নির্মাতা যুবরাজ শামীম। যিনি সিনেমা নির্মাণের জন্য শুরু থেকেই ঢাকাকে এড়িয়ে চলছেন। নন্দিপাড়া, টঙ্গী এলাকা তার কাজের যায়গা। টঙ্গীতে বানানো তার সিনেমা ‘আদিম’ ইতোমধ্যেই উঠে এসেছে মূল্ধারার আলোচনায়। তার আদিম সিনেমা ‘মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে’ অংশ নিয়ে জিতেছে পুরস্কারও। বর্তমানে তিনি গাজীপুর জেলার নন্দীপুর গ্রামে গড়ে তুলেছেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। সেখান থেকে নির্মাণ করেছেন ‘অতল, ‘গন্ধম, ‘এক ঋতুর অনন্তকাল’ ইত্যাদি সিনেমা। নিজের মতো করে সিনেমার শুটিং করে পোস্টপ্রোডাকশনের কাজ করছেন। সেগুলো পাঠাচ্ছেন ভেনিস, রটারডামসহ বড় বড় উৎসবে।

বরিশালে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি
এই বিকেন্দ্রীকরণের তালিকায় আছে বরিশালও। বরিশাল থেকেই কাজ করছেন নির্মাতা সুব্রত সঞ্জীব। তিনি প্রয়োজনে ঢাকা থেকে তারকাদের বরিশাল নিয়ে আসেন। এই নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার জানিয়েছেন, তার স্বপ্ন বরিশালে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা। সুব্রত সঞ্জীব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নাটক নির্মাণ করলেও আমার স্বপ্ন সিনেমা। সেই সিনেমার কাজও আমি বরিশালে করতে চাই। সেই প্রস্তুতি নিয়েই এগোচ্ছি।’
এইসকল তরুণ নির্মাতাদের সাহস ও প্রাণসক্তি ইতোমধ্যেই সঞ্চার হয়েছে দেশের প্রান্তে পড়ে থাকা নির্মাণ সংশ্লিষ্ট তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও।