গতকাল ৫ আগস্ট ছিলো জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। দিনটিকে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী স্মরণ করা হয়। এসময় এই আন্দোলনের আশা-আকাংখা ও আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পেছনের গল্প দেশের এক গণমাধ্যমের সাথে সাক্ষাৎকালে প্রকাশ করেছেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরি হক বাঁধন।
সাক্ষাৎকারে আজমেরি হক বাঁধনকে জিজ্ঞেস করা হয় নানা বাধার মুখে রাজপথে নেমেছিলেন, এবং পরে নানাভাবে হয়রানির শিকারও হয়েছেন। তারপরও সেই সময়ে কোন বিষয়টা তাঁকে সবচেয়ে বেশি সাহস জুগিয়েছিল?
উত্তরে বাঁধন বলেন,’আমি তো একা আসতে পারিনি। আমাদের কয়েকটি সংগঠনের অনেকে মিলে প্রথম, পয়লা আগস্ট রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। মিডিয়াকর্মী, আলোকচিত্রীসহ অনেকেই ছিলেন। প্রথমে আমাদের সংসদ ভবনের সামনে পুলিশ দাঁড়াতে দেয়নি। তারা আমাদের বলল, এটা দেশের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে…এমন নানা কথা। তখন আমি আর আমিরুল রাজীব, তিনি একজন অ্যাকটিভিস্ট; আমরা পুলিশের সঙ্গে তর্ক করি। কেন দাঁড়াতে দেবে না। আকরাম ভাই, ধ্রুব ভাই, জুলহাস ভাই, তানভীর, জাহিনসহ অনেকেই ছিল। একপর্যায়ে আমরা আনন্দ সিনেমা হলের সামনে চলে আসতে বাধ্য হই।
তবে সাহস সঞ্চার করা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে আমার মধ্যে সাহসটা তৈরি হয় ছাত্রছাত্রীদের সাহস দেখে। আর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে নিজ বাসার ছাদে গুলিতে নিহত ছয় বছর বয়সী রিয়া গোপের মৃত্যু আমাকে নাড়া দিয়েছিল।‘

‘জনগণের পাশে থেকে দেখেন, জীবনটাকে অন্যভাবে অনুভব করতে পারবেন’
সেই আন্দোলনের সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল জানতে চাইলে বাঁধন বলেন,’পরের দিন ২ আগস্ট বাসা থেকে বের হওয়াই কঠিন ছিল। আনু মুহাম্মদ স্যারের এক দফা এক দাবিতে যাব কি না, বুঝতে পারি না। বাসা থেকে বের হওয়া নিষেধ। এর মধ্যে হুমকি তো ছিল। যাওয়া নিয়ে দোটানায় ছিলাম। পরে আমিরুল ভাই বললেন, ‘জীবনের একটিবার জনগণের পাশে থেকে দেখেন, জীবনটাকে অন্যভাবে অনুভব করতে পারবেন।’ তাঁর কথা শুনেই দ্রোহযাত্রায় যাই। এটা ছিল আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং। কারণ, প্রতিদিন আমার জন্য নানা বাধা থাকত বাসা থেকে।
এছাড়াও জানতে চাওয়া হয়, ৫ আগস্ট কীভাবে বের হয়েছিলেন। জবাবে বাঁধন বলেন,’৫ আগস্ট আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিন। সকালে ঘর থেকে বের হব কি না, সেটাই ভাবছিলাম। আমি সাড়ে ১০টায় বাসা থেকে বের হই। তখন বাসার সবাই কান্নাকাটি করছিল। আমার বাবা আমাকে হাত ধরে বলেছিল, যেয়ো না। পরে বোরকা পরে বের হই। হেঁটে ইসিবি চত্বর পার হয়ে দেখি, কালশী ফ্লাইওভারে হাজার হাজার মানুষ। পরে সব রাস্তায় দেখতে পাই, লাখো মানুষের ভিড়।
এরপর তিনি বলেন, ‘দুপুর সাড়ে ১২টার পর বুঝতে পারি, কিছু একটা হয়েছে। পরে সেনাপ্রধান জানান, জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। তখন পদত্যাগের খবর শুনতে পাই। রাস্তায় রব উঠে গেছে, প্রধানমন্ত্রী পালিয়েছেন। তখন আমি রিকশা নিয়ে পুরো ঢাকা ঘুরি। সবার উল্লাস দেখি, কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে। এটা আমার জন্য স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে।‘
এরপর বাঁধনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ৫ আগস্ট তাঁর জীবনকে কতটা পরিবর্তন করে দিয়েছে। জবাবে এই অভিনেত্রী জানান,’৫ আগস্টের পর আমার জীবন অনেকটাই বদলে গেল। একধরনের স্বপ্ন, আশা ছিল। বিকেলটায় সেটাই যেন পেয়েছিলাম। এর মধ্যে অনেক দুর্ঘটনা ঘটলেও অনেকেই দেশটাকে আগলে রেখেছিল। আমার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি দেশটায় পরিবর্তন হওয়া শুরু হলো, আমরা সবাই এক হয়ে দেশটাকে পরিবর্তন করব।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের মতের বিশ্বাসের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এক হয়ে সবাই দেশটাকে গড়ে তুলতে পারব, সেই বিশ্বাস ছিল। কিন্তু ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময় যে পরিমাণ দুর্নীতি, যে পরিমাণে মব কালচার, যে পরিমাণ নারীর প্রতি সহিংসতা এবং মাজার ভাঙা, বাউলদের ওপর আক্রমণ করা, ম্যুরাল ভাঙা, শেখ মুজিবের মূর্তি ভেঙে ফেলা, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ভেঙে ফেলা, অনেক পুলিশ স্টেশনে আগুন দেওয়া-এগুলো আমাকে সময়ের সঙ্গে খুব তাড়িত করেছে।‘
‘দেশপ্রেম আমার মধ্যে কিছুটা হলেও আছে’
জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাঁধনের জায়গা থেকে দেশটাকে তিনি কীভাবে দেখতে চেয়েছিলেন এবং সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, জানতে চাইলে বাঁধন বলেন,’বাংলাদেশ নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। দেশপ্রেমটা তো আস্তে আস্তে তৈরি হয়। এটাকে ডেভেলপ করতে হয়। জন্ম থেকে কেউ দেশপ্রেমী হয় না। এই দেশপ্রেম আমার মধ্যে কিছুটা হলেও আছে। দেশ, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা আছে।
তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন এমন ছিল, একটা দেশের, সমাজের; যেখানে ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে প্রতিটা বিশ্বাসের মানুষ তার স্বাধীনতা বুঝে পারবে। যার যে মর্যাদা, সে সেটা বুঝে পাবে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ হবে, বৈষম্যহীন একটা সমাজব্যবস্থা হবে। সেই প্রত্যাশার জায়গাটা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময় যা যা হয়েছে, সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত। সেটা আমাকে আশাহত করেছে।‘
এরপরে বাধনের কাছে জানতে চাওয়া হয়,এখনো কোনো কিছু নিয়ে তিনি আতঙ্কিত হন কিনা?
এসময় বাঁধন বলেন,’এখন আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে হতাশা বেশি। আমি যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম, এই বুঝি পরিবর্তন শুরু হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তন শুরু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখতে পাচ্ছি না। এটা আমাকে হতাশ করছে।
এছাড়াও, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় যে, গণতান্ত্রিক সরকার ফেরার পর গত ছয় মাসে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েছে কিনা।
বাঁধনের ভাষ্যমতে, ‘সত্যি বলতে, আমার স্বপ্ন ছিল, ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময় থেকেই অনেক পরিবর্তন দেখব। ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময়েই সেটা হয়নি আর ছয় মাসে কী ইতিবাচক পরিবর্তন দেখব। আমি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না।
কেন এমনটা হচ্ছে, তাঁর ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান থেকে একেবারেই সব শিল্পীর কাজ কমে গেছে। আমি দীর্ঘ সময় কোনো কাজ করতে পারিনি। বসে ছিলাম। পরে রুবাইয়াত হোসেন ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নিয়ে আমার কাছে আসে। যে সিনেমা এবার ভেনিসে নির্বাচিত হয়েছে। তখন সে আমাকে ডিপ্রেশন থেকে বের করে। সিনেমা করে একটু চলতে পারি। আবার নিজেকে খুঁজে পাই। নিজেকে গোছাতে পারি।

জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের কষ্ট ভাবায়
৫ আগস্টে কি বিষয় বাঁধনকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় জানতে চাইলে তিনি,’যাঁদের গণ-অভ্যুত্থানে হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের পরিবারের জন্য কষ্ট ভাবায়। যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের আত্মা হয়তো শান্তি পাবে। কিন্তু যাঁরা পরিবারের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁদের কষ্ট এখনো শেষ হয়নি। এর কোনো শেষও নেই। সারা জীবন তাঁদের এই কষ্ট বয়ে বেড়াতে হবে। এ ছাড়া যাঁদের অঙ্গহানি হয়েছে, মারাত্মক আহত হয়েছিলেন, সেটাও আমাকে ভাবায়। সেই সঙ্গে এই যে দেশের পরিবর্তন হলো না, কোনো পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছি না, সেটাও একধরনের ভাবনার জায়গা তৈরি করে।‘
বাঁধনের অনেক সহকর্মী স্বৈরাচারী সরকার পরিবর্তনের পর মিডিয়ায় কাজ পাচ্ছেন না,এটা তাঁকে ভাবায় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একজন শিল্পীর সব সময়ই কাজ করতে পারার কথা। কিন্তু সত্যি বলতে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুরো এক বছর আমার কোনো কাজ ছিল না। বিষয়টা এমন নয় যে আমার অনেক কাজ, অন্যরা করতে পারছেন না। যাঁরা কাজ করতে চান বা যাঁরা কাজ করতেন, তাঁরা তাঁদের মতো কাজ করতে পারার কথা। এমনটাও হতে পারে, কেউ যোগাযোগ কম করছে বা সেই অর্থে চরিত্র নেই।
তিনি বলেন, ‘বলা যায়, আমিই বছরে একটা চরিত্র খুঁজে পাই না। আমাদের এখানে একটা বয়সের পর মেয়েদের মিডিয়ায় কাজ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন। আর একজন শিল্পী তার যত দিন ইচ্ছা কাজ করবে। শিল্পীর দলীয় বিশ্বাস, নীতিগত কারণে বাধাপ্রাপ্ত হবে বলে আমি মনে করি না বা বাধাপ্রাপ্ত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি না।
কোন বিশ্বাসের কারণে কাজ থেকে ব্যান করা গ্রহণযোগ্য নয়
অনেক শিল্পী মানবেতর জীবন যাপন করছেন এ ব্যাপারে তিনি বলেন,’যেকোনো মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার আছে যেকোনো দলকে সমর্থন করার। যে কেউ এটা করতে পারে না। তার সেই বিশ্বাসের কারণে তাকে কাজ থেকে ব্যান করা হবে কিংবা কাজে নেওয়া হবে না-এমন ঘটনা যদি ঘটে, এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। আমার কথাই যদি বলি, ‘মাস্টার’, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’, ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমা করলাম দেখে মনে হচ্ছে অনেক কাজ করে ফেলেছি এক বছরে।
আসলে এই তিনটা সিনেমা, তিন বছরের কাজ। বছরে যদি একটা কাজ হয়, সেটা থেকে কি বছর চলার মতো কোনো অর্থ আসে! আসে না। আমি আমার বাবার বাসায় থাকি। সেখানে আমাকে ভাড়া দিতে হয় না, বাবার গাড়িতে চড়ি। গাড়ির খরচটা হয়তো দিই। এখন আমার জীবনের চাহিদা কম বলে এত সব ম্যানেজ করে চলতে পারি। কিন্তু আমার মনে হয় না যে এখানে খুব বেশি শিল্পীর বিলাসবহুল জীবন যাপন করার সুযোগ রয়েছে। এটা নিজেকে দিয়েই বোঝানো যায়।
আপনিই একমাত্র অভিনেত্রী, কান চলচ্চিত্র উৎসবের পর ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমা দিয়ে ভেনিসে যাচ্ছেন। সিনেমায় অতিথি চরিত্রে কেন নাম লিখিয়েছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চিত্রনাট্যের গল্প সম্পর্কে আগে থেকেই জানতাম। যখন আমার চরিত্র গল্পে ছিল না, আমার কাজ করারও কথা ছিল না, তখন থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম, সিনেমাটি কান বা ভেনিসে যাবে। যে কারণে রুবাইয়াত আমাকে প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হই। ‘রেহানা’, ‘মাস্টার’ সিনেমার পর নানা গল্পে কাজ করে সেই অভিজ্ঞতা একটু হলেও হয়েছে।
‘এ স্বাধীনতা একেবারেই আমার‘
তবে সম্প্রতি এই নায়িকা ‘গুলশানের চামেলি’ সিনেমায় নাম লিখিয়েছেন। নতুন সিনেমায় নাম লেখানোর ক্ষেত্রে কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিনেমাটিকে প্রথমত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ, এটি নারীপ্রধান চরিত্র। এটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমার চরিত্রটা আমার কাছে ঠিকঠাক লেগেছে। আমার সম্মানী ও সম্মান, দুটোই আমার যোগ্যতামতোই দিচ্ছে। যে কারণেই আমি রাজি হয়েছি। তবে এখনো সাইনিং হয়নি। এ সপ্তাহে সাইনিং করার কথা রয়েছে। আর বড় কথা, আমি কোন সিনেমা করব, কোনটা কবর না, এ স্বাধীনতা একেবারেই আমার। আমি সেই স্বাধীনতা উপভোগ করতে চাই।‘








