Sunday, October 18, 2026

আই লাভ লুসি – ৭৫ বছরে টিভির ইতিহাস বদলে দেওয়া কমেডি সিরিজ

অমিতাভ বচ্চন – যে গল্প কখনো বলা হয়নি

October 16, 2026

আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা নায়িকা কে ?

October 12, 2026

সালমান শাহ কেন এত অল্প সময়ে কিংবদন্তি হয়ে গেলেন?

October 2, 2026

কেন অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যাওয়া ছেড়ে দিলেন আমির খান?

September 26, 2026

সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোর অবিশ্বাস্য গল্প 

September 17, 2026

ছোট্ট সংসার, স্বামী-স্ত্রীর খুনসুটি আর এক গৃহবধূর রঙিন স্বপ্ন, এসব নিয়েই ১৯৫১ সালে যাত্রা শুরু করেছিল মার্কিন কমেডি সিরিজ ‘আই লাভ লুসি’। দেখতে দেখতে ৭৫ বছরে পা রাখছে লুসি ও রিকির সেই চিরচেনা গল্প। সময় বদলেছে, বদলেছে টেলিভিশনের জগৎ; কিন্তু লুসির দুর্দান্ত অভিনয়, মজার কাণ্ডকারখানা আর পর্দার আড়ালের নানা গল্প আজও দর্শকদের আগ্রহ জাগায়। শুধু হাসির খোরাক নয়, অভিনয় ও নির্মাণশৈলীতে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করে সিরিজটি বদলে দিয়েছিল টেলিভিশনের ইতিহাসও।

১৯৫১ সালের ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস চ্যানেলে প্রথম প্রচারিত হয় সিরিজটি। লুসিল বল ও দেসি আরনাজ অভিনীত এই সিরিজ শুধু দর্শকদের বিনোদন দেয়নি, বদলে দিয়েছিল টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণের ধরনও। ছয়টি মৌসুমে ১৮০টি আধা ঘণ্টার পর্ব প্রচারের পর ১৯৫৭ সালের ৬ মে শেষ হয় এর নিয়মিত যাত্রা। তবে লুসি ও রিকির গল্প সেখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ‘দ্য লুসি-দেসি কমেডি আওয়ার’ নামে আরও ১৩টি এক ঘণ্টার বিশেষ পর্বে ফিরে আসেন তাঁরা।

সংসারের গল্পে হাসির জাদু

‘আই লাভ লুসি’র কেন্দ্রে ছিলেন লুসি রিকার্ডো। চরিত্রটিতে অভিনয় করেন লুসিল বল। প্রাণবন্ত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লুসি সংসারের পাশাপাশি শোবিজে নিজের জায়গা তৈরি করতে চাইতেন। তাঁর স্বামী রিকি রিকার্ডো ছিলেন একজন সফল কিউবান ব্যান্ডলিডার। চরিত্রটিতে অভিনয় করেন দেসি আরনাজ। নিউইয়র্কের একটি অ্যাপার্টমেন্টে তাঁদের সংসার। রিকি কাজ করতেন ট্রপিকানা নাইটক্লাবে।

স্বামীর কর্মজগতে যুক্ত হতে লুসি একের পর এক পরিকল্পনা করতেন। কিন্তু বেশির ভাগ সময় সেসব পরিকল্পনা থেকেই তৈরি হতো নতুন বিপত্তি। কখনো মঞ্চে ওঠার চেষ্টা, কখনো সামর্থ্যের বাইরে কিছু কেনা, আবার কখনো নিজের বুদ্ধিতে সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে আরও বড় ঝামেলায় পড়া এসবই ছিল সিরিজটির হাসির মূল উপাদান।

লুসির বন্ধু ও প্রতিবেশী এথেল মার্টজের চরিত্রে অভিনয় করেন ভিভিয়ান ভ্যান্স। এথেলের স্বামী ফ্রেড মার্টজের ভূমিকায় ছিলেন উইলিয়াম ফ্রলি। ফ্রেড ছিলেন হিসাবি ও কিছুটা বদমেজাজি। রিকির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব এবং এথেলের সঙ্গে খুনসুটি গল্পে বাড়তি মজা যোগ করত। পরবর্তী মৌসুমগুলোতে লুসি ও রিকির ছেলে লিটল রিকির চরিত্রে যুক্ত হন কিথ থিবোডো, যিনি রিচার্ড কিথ নামেও পরিচিত ছিলেন।

আই লাভ লুসি

নির্মাণের পেছনে তিন পরিচালক ও লেখক

সিরিজটির তিন প্রধান পরিচালক ছিলেন উইলিয়াম অ্যাশার, জেমস ভি. কার্ন ও মার্ক ড্যানিয়েলস। তাঁরা যথাক্রমে ১০২, ৪০ ও প্রথম ৩৯টি পর্ব পরিচালনা করেন। নির্মাতা, প্রযোজক ও প্রধান লেখক জেস ওপেনহাইমারের সঙ্গে চিত্রনাট্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ম্যাডেলিন পাগ, যিনি পরে ম্যাডেলিন ডেভিস নামে পরিচিত হন, এবং বব ক্যারল জুনিয়র। তাঁরা ১৮০টি পর্বের জন্যই লেখালেখি করেন। অনেক গল্পের ধারণা এসেছিল লুসিল বলের আগের রেডিও অনুষ্ঠান ‘মাই ফেভারিট হাজব্যান্ড’ থেকে।

ক্যামেরার পেছনেও বিপ্লব

লুসিল বল ও দেসি আরনাজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দেসিলু প্রোডাকশনসের অধীনে তৈরি হয় ‘আই লাভ লুসি’। সিরিজটি টেলিভিশন নির্মাণেও নতুনত্ব আনে। দেসি আরনাজ ও চিত্রগ্রাহক কার্ল ফ্রয়েন্ডের উদ্যোগে একসঙ্গে তিনটি ৩৫ মিলিমিটার ফিল্ম ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। এতে একই সময়ে প্রশস্ত, মাঝারি ও কাছের দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব হতো।

স্টুডিওতে দর্শকদের সামনে অভিনয় করে অনুষ্ঠান ধারণ করাও ছিল এর বিশেষত্ব। দর্শকদের হাসি ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অভিনয়কে প্রাণবন্ত করত। এ জন্য আলো, দর্শকদের বসার জায়গা এবং ক্যামেরা চলাচলের ব্যবস্থাও বিশেষভাবে সাজানো হয়েছিল।

আই লাভ লুসি

উচ্চমানের ফিল্মে ধারণ করার ফলে পর্বগুলো দীর্ঘদিন ভালো অবস্থায় রাখা সম্ভব হয়। পরে সেগুলো পুনঃপ্রচার ও অন্য চ্যানেলের কাছে বিক্রি করার সুযোগ তৈরি হয়। টেলিভিশনের পুনঃপ্রচার ও সিন্ডিকেশনের প্রসারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পর্দার আড়ালে দূরত্ব ও বিতর্ক

পর্দায় এথেল ও ফ্রেড ছিলেন স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু বাস্তবে ভিভিয়ান ভ্যান্স ও উইলিয়াম ফ্রলির সম্পর্ক ভালো ছিল না। ফ্রলি ভ্যান্সের চেয়ে ২২ বছরের বড় ছিলেন। তাঁকে স্বামী হিসেবে নির্বাচনের খবর শুনে ভ্যান্স আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে প্রচলিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

ফ্রলির মদ্যপানের অভ্যাস নিয়েও আলোচনা ছিল। দেসি আরনাজ তাঁকে সতর্ক করেছিলেন, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কাজে আসা বা এ কারণে কাজ মিস করা চলবে না। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ফ্রলি কাজের দিন অনুপস্থিত থাকেননি। বেসবলের প্রতিও তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। নিউইয়র্ক ইয়াঙ্কিজ দল ওয়ার্ল্ড সিরিজে উঠলে ছুটি নেওয়ার বিশেষ শর্ত চুক্তিতে রেখেছিলেন বলেও একটি গল্প প্রচলিত রয়েছে।

রিকির ইংরেজি উচ্চারণ নিয়েও হাস্যরস তৈরি হতো। তবে লেখকেরা চাইতেন, মূলত লুসিই যেন এ নিয়ে মজা করেন। অন্য চরিত্রদের একই ধরনের ঠাট্টা দর্শকদের কাছে অমার্জিত মনে হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল।

সন্তানসম্ভবা হওয়ার গল্পেও বাধা

১৯৫০ এর দশকে টেলিভিশনে ব্যক্তিগত বিষয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ ছিল। লুসিল বল যখন দ্বিতীয়বারের মতো মা হতে যাচ্ছিলেন, দেসি আরনাজ চেয়েছিলেন বিষয়টি সিরিজের গল্পেও থাকুক। সিবিএস কর্তৃপক্ষের আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত অনুমতি মেলে। তবে ‘প্রেগন্যান্ট’ শব্দটির বদলে ‘এক্সপেক্টিং’ অর্থাৎ সন্তানসম্ভবা শব্দটি ব্যবহার করা হতো। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, চিত্রনাট্য ধর্মীয় প্রতিনিধিদেরও পর্যালোচনা করতে দেওয়া হয়েছিল।

সিরিজটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল ফিলিপ মরিস সিগারেট কোম্পানি। লুসিল বল চেস্টারফিল্ড সিগারেট পছন্দ করতেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তাই শুটিংয়ে স্পনসরের প্যাকেটের বদলে তাঁর জন্য চেস্টারফিল্ড ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হতো বলে একটি গল্প প্রচলিত আছে।

বর্তমানে পরিচিত লাল সাটিনের হৃদয়চিহ্নটি মূল সম্প্রচারে ছিল না। তখন লুসি ও রিকিকে নিয়ে অ্যানিমেটেড দৃশ্যের মাধ্যমে সিগারেটের বিজ্ঞাপন দেখানো হতো। ‘টম অ্যান্ড জেরি’র নির্মাতা উইলিয়াম হানা ও জোসেফ বারবেরা এই কার্টুন তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে পুনঃপ্রচারের সময় বিজ্ঞাপনের অংশ বাদ দিয়ে হৃদয়চিহ্নটি ব্যবহার করা হয়।

হাসির দৃশ্যেও ছিল বিপদের গল্প

‘লুসি’স ইতালিয়ান মুভি’ পর্বের আঙুর মাড়ানোর দৃশ্যটি ছিল স্মরণীয়। প্রচলিত একটি গল্প অনুযায়ী, দৃশ্য ধারণের সময় এক নারী অতিরিক্ত শিল্পী পরিচালকের নির্দেশ বুঝতে না পেরে সত্যিই লুসিল বলের মাথা আঙুরের মিশ্রণের মধ্যে চেপে ধরেন। এতে বলের শ্বাস নিতে সমস্যা হয় এবং দৃশ্য ধারণ বন্ধ করতে হয়।

১৯৫৩ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রচারিত ‘লুসি গোজ টু দ্য হসপিটাল’ পর্বে লুসি ও রিকির ছেলে লিটল রিকির জন্ম দেখানো হয়। সে সময়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ দর্শক পর্বটি দেখেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ টেলিভিশন-পরিবার অনুষ্ঠানটি দেখেছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরদিন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ারের অভিষেক অনুষ্ঠান দেখেছিলেন প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ দর্শক।

এই পর্ব নিয়ে আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে। যুক্তরাষ্ট্রের টোলেডো শহরে অনুষ্ঠান চলার সময় পানির ব্যবহার প্রায় স্থির ছিল, কিন্তু শেষ হতেই তা বেড়ে যায়। ধারণা করা হয়, দর্শকেরা অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে দৈনন্দিন কাজ পিছিয়ে দিয়েছিলেন। তবে এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত নয়।

লুসিল বলের মা ডিডি বলও নাকি প্রায় প্রতিটি ধারণের সময় স্টুডিওতে উপস্থিত থাকতেন। দর্শকদের হাসির মধ্যে তাঁর ‘আহ-ওহ’ ধরনের প্রতিক্রিয়া শোনা যেত এবং সেই কণ্ঠ হাসির রেকর্ডে থেকে গিয়েছিল, এমন গল্পও প্রচলিত রয়েছে।

সংসার ভেঙেছে, উত্তরাধিকার রয়ে গেছে

পর্দায় লুসি ও রিকির সম্পর্ক ছিল হাসি, অভিমান ও ভালোবাসায় ভরা। কিন্তু বাস্তব জীবনে কাজের চাপ ও ব্যক্তিগত জটিলতা তাঁদের দাম্পত্যে প্রভাব ফেলে। ১৯৬০ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। একই বছর শেষ হয় ‘দ্য লুসি-দেসি কমেডি আওয়ার’ এর যাত্রা।

এরপর লুসিল বল দেসির কাছ থেকে দেসিলু প্রোডাকশনসের শেয়ার কিনে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব নেন। বড় হলিউড স্টুডিও পরিচালনাকারী প্রথম নারী হিসেবে তিনি পরিচিতি অর্জন করেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ‘স্টার ট্রেক’, ‘মিশন: ইম্পসিবল’ ও ‘দ্য আনটাচেবলস’ এর মতো জনপ্রিয় সিরিজ তৈরিতে যুক্ত হয়।

১৯৫৭ সালে নিয়মিত প্রচার শেষ হলেও ‘আই লাভ লুসি’র জনপ্রিয়তা হারিয়ে যায়নি। সাধারণ মানুষের সংসার, ছোট ছোট স্বপ্ন, ভুল সিদ্ধান্ত ও সম্পর্কের টানাপোড়েনকে হাসির মধ্যে তুলে ধরেছিল সিরিজটি। পাশাপাশি ক্যামেরা ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি ও পুনঃপ্রচারের সুযোগ তৈরি করে টেলিভিশনের ভবিষ্যৎ নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছিল এটি।

লুসি বারবার নিজের পরিকল্পনায় ব্যর্থ হয়েছেন, বিপদে পড়েছেন, রিকিকে বিরক্ত করেছেন। তবু তাঁর নতুন করে চেষ্টা করার আনন্দই দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। এভাবেই ‘আই লাভ লুসি’ হয়ে উঠেছে হাসির আড়ালে টেলিভিশনের ইতিহাস বদলে দেওয়া এক গল্প।

 

Share

Read more

Local News