হ্যালোইন উৎসবে! হ্যালোইনের মৌসুম মানেই শুধু ভূত, দানব বা অতিপ্রাকৃত গল্প নয়। অনেক সময় নিঃসঙ্গতা, মানুষের অন্ধকার দিক, ক্ষমতার লড়াই কিংবা অজানা রহস্যও তৈরি করতে পারে ভয়ের অনুভূতি। এই তালিকার সিনেমাগুলোতে নেই একই ধরনের গল্প। কোথাও মহাকাশের বিশাল শূন্যতা, কোথাও অপরাধ জগতের নির্মমতা, কোথাও ধনী সমাজের ভণ্ডামি, আবার কোথাও সম্পর্কের জটিলতা। তবে সবকটির মধ্যেই রয়েছে একটি বিষয়, এক ধরনের অস্বস্তিকর, গভীর এবং মনে থেকে যাওয়ার মতো আবহ।
অ্যাড অ্যাস্ট্রা (Ad Astra)
মুক্তির তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ পরিচালক: জেমস গ্রে ধরন: বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা অভিনয়: ব্র্যাড পিট, টমি লি জোন্স, রুথ নেগা, লিভ টাইলার
ব্র্যাড পিট অভিনীত অ্যাড অ্যাস্ট্রা সাধারণ মহাকাশ অভিযানের গল্প নয়।এটি মূলত একজন মানুষের নিজের ভেতরের শূন্যতা, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক এবং বাবার সঙ্গে অসমাপ্ত অধ্যায়ের মুখোমুখি হওয়ার গল্প।

সিনেমার প্রধান চরিত্র রয় ম্যাকব্রাইড একজন মহাকাশচারী। তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অস্বাভাবিক মানসিক নিয়ন্ত্রণ। ভয়ংকর পরিস্থিতিতেও তিনি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। কিন্তু সিনেমা ধীরে ধীরে প্রশ্ন তোলে-এই নিয়ন্ত্রণ কি আসলেই শক্তি, নাকি নিজের অনুভূতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটি উপায়?
গল্পে দেখা যায়, সৌরজগতের বিভিন্ন স্থানে রহস্যময় শক্তির বিস্ফোরণ ঘটছে, যা পৃথিবীর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। তদন্ত করতে গিয়ে রয় জানতে পারেন, এই ঘটনার
সঙ্গে বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তাঁর বাবা এইচ ক্লিফোর্ড ম্যাকব্রাইডের সম্পর্ক থাকতে পারে। বাবাকে খুঁজে বের করার জন্য শুরু হয় সৌরজগতজুড়ে এক দীর্ঘ যাত্রা।
তবে এই যাত্রা শুধু মহাকাশের নয়। এটি একজন ছেলের নিজের বাবার প্রতি জমে থাকা অভিমান, ভালোবাসা এবং অসমাপ্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার যাত্রা। পরিচালক জেমস গ্রে মহাকাশকে এখানে কোনো রোমাঞ্চকর জায়গা হিসেবে দেখাননি। বরং এটি বিশাল, নীরব এবং ভয়ংকর এক শূন্যতা। চাঁদ, মঙ্গল কিংবা অন্য গ্রহে মানুষের
উপস্থিতিও এখানে আশার প্রতীক নয়; বরং মানুষের একাকিত্বের আরেকটি চিত্র। অ্যাড অ্যাস্ট্রা ধীরগতির হলেও এর পরিবেশ, ভিজ্যুয়াল এবং ব্র্যাড পিটের সংযত অভিনয় সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
নাইটক্রলার (Nightcrawler)
নাইটক্রলার (Nightcrawler) মুক্তির তারিখ: ৩১ অক্টোবর ২০১৪ পরিচালক: ড্যান গিলরয় ধরন: অপরাধ, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার অভিনয়: জেক গিলেনহাল, রেনে রুশো, রিজ আহমেদ লস অ্যাঞ্জেলেসের রাতের অন্ধকার জগতকে কেন্দ্র করে তৈরি নাইটক্রলার আধুনিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী ক্রাইম থ্রিলার। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র লু ব্লুম। শুরুতে তাকে একজন ছোটখাটো চোর হিসেবে দেখা যায়।

কিন্তু রাতে দুর্ঘটনা ও অপরাধের দৃশ্য ধারণ করে সংবাদমাধ্যমে বিক্রি করার সুযোগ পাওয়ার পর তার জীবন বদলে যায়। ক্যামেরা হাতে নিয়ে লু শহরের রাস্তায় ঘুরতে থাকে। তার লক্ষ্য একটাই-সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে চমকপ্রদ ফুটেজ সংগ্রহ করা। ধীরে ধীরে সাফল্যের জন্য সে নৈতিকতার সব সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে। লু ব্লুম চরিত্রে জেক গিলেনহালের অভিনয় সিনেমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
চরিত্রটি ভয়ংকর, কারণ সে কোনো অতিপ্রাকৃত খলনায়ক নয়। সে একজন সাধারণ মানুষ, যে নিজের লোভ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং স্বার্থপরতাকে সাফল্যের নাম দেয়। সিনেমাটি শুধু একজন অপরাধীর গল্প নয়। এটি দেখায়, দর্শকের মনোযোগ পাওয়ার জন্য সংবাদমাধ্যম এবং সমাজ কীভাবে কখনো কখনো মানুষের দুর্ভোগকেও পণ্যে পরিণত করতে পারে। ড্যান গিলরয়ের পরিচালনায় নাইটক্রলার একটি অস্বস্তিকর কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী চলচ্চিত্র।
দ্য মেনু (The Menu)
মুক্তির তারিখ: ১৮ নভেম্বর ২০২২ পরিচালক: মার্ক মাইলড ধরন: হরর, ব্ল্যাক কমেডি, থ্রিলার অভিনয়: রালফ ফাইনস, আনিয়া টেলর-জয়, নিকোলাস হোল্ট
একটি বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ, বিশ্বের অন্যতম সেরা শেফ এবং কয়েকজন ধনী অতিথি-শুরুতে দ্য মেনু একটি অভিজাত খাবারের গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু রাত যত এগোয়, ততই পরিষ্কার হয় যে এই আয়োজনের পেছনে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর কিছু। গল্পে ধনী ভোজনরসিক টাইলার লেডফোর্ড তার সঙ্গী মার্গোকে নিয়ে।

একটি প্রত্যন্ত দ্বীপে যায়। সেখানে বিখ্যাত শেফ জুলিয়ান স্লোইক বিশেষ এক রাতের খাবারের আয়োজন করেছেন। প্রতিটি খাবারের সঙ্গে প্রকাশ পেতে থাকে অতিথিদের ব্যক্তিত্ব, অহংকার এবং সমাজের শ্রেণিগত বৈষম্য। রালফ ফাইনস শেফ স্লোইক চরিত্রে অসাধারণ। শান্ত, নিয়ন্ত্রিত কিন্তু ভয়ংকর উপস্থিতি দিয়ে তিনি চরিত্রটিকে স্মরণীয় করে তুলেছেন। অন্যদিকে আনিয়া টেলর-জয় অভিনীত মার্গো চরিত্রটি পুরো গল্পে দর্শকের চোখের প্রতিনিধিত্ব করে।
অন্য অতিথিদের মতো সে অন্ধভাবে বিলাসিতা ও বিশেষাধিকারের অংশ নয়। পরিচালক মার্ক মাইলড খাবারের জগতকে ব্যবহার করেছেন ধনী সমাজ, শিল্পের অহংকার এবং ভোগবাদ নিয়ে ব্যঙ্গ করার জন্য। দ্য মেনু একই সঙ্গে হাসায়, অস্বস্তিতে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়-আমরা যা উপভোগ করি, তার পেছনে আসলে কী লুকিয়ে থাকে?
ওয়েক আপ ডেড ম্যান: আ নাইভস আউট মিস্ট্রি (Wake Up Dead Man: A Knives Out Mystery)
মুক্তির তারিখ: ২০২৫ পরিচালক: রায়ান জনসন ধরন: রহস্য, ক্রাইম, গথিক থ্রিলার অভিনয়: ড্যানিয়েল ক্রেগ, জশ ব্রোলিন, জশ ও’কনর
রায়ান জনসনের জনপ্রিয় নাইভস আউট সিরিজের তৃতীয় অধ্যায় ওয়েক আপ ডেড ম্যান: আ নাইভস আউট মিস্ট্রি আবারও ফিরিয়ে আনে বিখ্যাত গোয়েন্দা বেনোয়া ব্ল্যাঙ্ককে। এই সিনেমায় ড্যানিয়েল ক্রেগ অভিনীত গোয়েন্দা ব্ল্যাঙ্ক এবার প্রবেশ করেন আরও অন্ধকার এক রহস্যের জগতে।

গল্পের পটভূমি একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়। সেখানে প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা মন্সিনিয়র জেফারসন উইকসের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ব্ল্যাঙ্কের সামনে আসে বিশ্বাস, ক্ষমতা এবং মানুষের গোপন উদ্দেশ্যের নানা স্তর। আগের নাইভস আউট সিনেমাগুলোর মতো এখানেও রয়েছে জটিল রহস্য, একাধিক সন্দেহভাজন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দর্শককে আটকে রাখার মতো গল্প।
তবে এই সিনেমার আবহ আগেরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি অন্ধকার। গির্জা, কবরস্থান এবং ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার সিনেমাটিকে গথিক রহস্যের অনুভূতি দেয়।
রায়ান জনসন শুধু একটি হত্যারহস্য তৈরি করেননি, বরং বিশ্বাস ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
ফ্যান্টম থ্রেড (Phantom Thread)
মুক্তির তারিখ: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ পরিচালক: পল থমাস অ্যান্ডারসন ধরন: ড্রামা, রোমান্স, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার অভিনয়: ড্যানিয়েল ডে-লুইস, ভিকি ক্রিপস, লেসলি ম্যানভিল প্রথম দেখায় ফ্যান্টম থ্রেড একটি বিলাসবহুল প্রেমের গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু পল থমাস অ্যান্ডারসনের এই সিনেমা আসলে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পর্কের জটিলতার গল্প।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রেনল্ডস উডকক। তিনি লন্ডনের একজন বিখ্যাত পোশাক ডিজাইনার, যার জীবন চলে কঠোর নিয়ম এবং নিখুঁত পরিকল্পনার মধ্যে।
নিজের কাজ, বাড়ি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক-সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চান তিনি। কিন্তু আলমার সঙ্গে পরিচয়ের পর তার সাজানো জীবনে পরিবর্তন আসে।
ভিকি ক্রিপস অভিনীত আলমা প্রথমে একজন সাধারণ তরুণী মনে হলেও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, সে রেনল্ডসের জীবনে শুধুমাত্র অনুপ্রেরণা হয়ে থাকতে চায় না।
ড্যানিয়েল ডে-লুইসের অভিনয় সিনেমার অন্যতম শক্তি। তাঁর চরিত্রের অহংকার, দুর্বলতা এবং আবেগের দ্বন্দ্ব খুব সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে। ফ্যান্টম থ্রেড প্রচলিত প্রেমের গল্প নয়। এটি এমন এক সম্পর্কের গল্প, যেখানে ভালোবাসার সঙ্গে মিশে থাকে নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা এবং মানসিক লড়াই।
হ্যালোইন উৎসবে দেখার জন্য ৫টি সিনেমা
রহস্য, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ও অন্ধকার আবহের সিনেমার তালিকা
| সিনেমার নাম | মুক্তির তারিখ | পরিচালক | ধরন | প্রধান অভিনয় | কেন দেখবেন |
|---|---|---|---|---|---|
| অ্যাড অ্যাস্ট্রা Ad Astra | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | জেমস গ্রে | বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা | ব্র্যাড পিট, টমি লি জোন্স | মহাকাশ অভিযানের মাধ্যমে বাবা-ছেলের সম্পর্ক ও আত্মঅনুসন্ধানের গল্প। |
| নাইটক্রলার Nightcrawler | ৩১ অক্টোবর ২০১৪ | ড্যান গিলরয় | অপরাধ, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার | জেক গিলেনহাল, রেনে রুশো | সংবাদ জগতের অন্ধকার দিক ও নৈতিকতার পতনের গল্প। |
| দ্য মেনু The Menu | ১৮ নভেম্বর ২০২২ | মার্ক মাইলড | হরর, ব্ল্যাক কমেডি, থ্রিলার | রালফ ফাইনস, আনিয়া টেলর-জয় | ধনী সমাজ ও ভোগবাদের ওপর ব্যঙ্গাত্মক হরর গল্প। |
| ওয়েক আপ ডেড ম্যান A Knives Out Mystery | ২০২৫ | রায়ান জনসন | রহস্য, ক্রাইম, গথিক থ্রিলার | ড্যানিয়েল ক্রেগ, জশ ব্রোলিন | এক রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও গোপন সত্যের অনুসন্ধান। |
| ফ্যান্টম থ্রেড Phantom Thread | ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ | পল থমাস অ্যান্ডারসন | ড্রামা, রোমান্স, থ্রিলার | ড্যানিয়েল ডে-লুইস, ভিকি ক্রিপস | প্রেম, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের জটিল সম্পর্কের গল্প। |
হ্যালোইন রহস্যে ঘেরা উৎসব
অক্টোবরের অন্ধকার আবহের সঙ্গে মানানসই সিনেমা দেখতে চাইলে সবসময় ভৌতিক সিনেমা বেছে নিতে হবে না। কখনো মহাকাশের নিঃসঙ্গতা, কখনো অপরাধীর মানসিকতা, কখনো ধনী সমাজের অন্ধকার দিক, আবার কখনো সম্পর্কের জটিলতাও তৈরি করতে পারে গভীর অস্বস্তি। অ্যাড অ্যাস্ট্রা, নাইটক্রলার, দ্য মেনু, ওয়েক আপ ডেড ম্যান এবং ফ্যান্টম থ্রেড-প্রতিটি সিনেমা আলাদা ধরনের অভিজ্ঞতা দেয়। রহস্য, মনস্তাত্ত্বিক গল্প এবং অন্ধকার আবহের সিনেমা পছন্দ করলে এই তালিকাটি আপনার সপ্তাহান্তের জন্য ভালো একটি শুরু হতে পারে।









