মাত্র ৩৫ টাকা মাসিক আয় দিয়ে যে জীবন শুরু, একসময় সেই মানুষটির সামনে এসেছিল ১ কোটি ৫০ লাখ রুপির গাড়ি কেনার সুযোগ। কিন্তু কৃষক পরিবারের দুর্দশার একটি দৃশ্য তাঁর সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। গাড়ি কেনার বদলে সেই অর্থ মানুষের কাজে লাগানোর পথ বেছে নিয়েছিলেন নানা পাটেকর।
নানা পাটেকরের মানবিকতার এমনই একটি ঘটনা সামনে এনেছেন ভারতীয় চিত্রনাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও পরিচালক রণবীর পুষ্প। চলতি মাসের শুরুতে সিদ্ধার্থ কান্নানের পডকাস্টে নানা পাটেকরের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং অভিনেতার ব্যক্তিজীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।
রণবীরের ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন টেলিভিশনে কৃষকদের আত্মহত্যা এবং তাঁদের পরিবারের দুর্দশার খবর দেখছিলেন নানা পাটেকর। খবরটি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। অথচ পরদিনই তাঁর ১ কোটি ৫০ লাখ রুপির একটি গাড়ি কেনার কথা ছিল।

কৃষকদের এমন পরিস্থিতি দেখার পর গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন নানা। বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। রণবীর জানান, কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে সহায়তা পৌঁছে দিতে নিজের এক শিল্পী বন্ধুকে ১৫ হাজার রুপির চেক তৈরি করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন নানা।
সেই সিদ্ধান্ত হয়তো কেবল একটি গাড়ি না কেনার ঘটনা ছিল না। কৃষকদের সংকটকে কাছ থেকে বোঝার পর তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কিছু করার ভাবনাও তৈরি হয় তাঁর মধ্যে। পরে সেই ভাবনাই আরও বড় উদ্যোগের দিকে এগিয়ে যায়।
কৃষকের পাশে দাঁড়ানো থেকে নাম ফাউন্ডেশন
২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, ফসলহানি ও ঋণের চাপে বহু কৃষক পরিবার কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে। কৃষকদের আত্মহত্যার খবরও সামনে আসছিল নিয়মিত। এই পরিস্থিতিতে নানা পাটেকর নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে যেতে শুরু করেন।
বিদর্ভ অঞ্চলে আত্মহত্যা করা কৃষকদের ৬২টি পরিবারকে ১৫ হাজার রুপি করে সহায়তা দেন তিনি। পরে লাতুর ও ওসমানাবাদ অঞ্চলের আরও ১১৩টি পরিবারকে একইভাবে অর্থসহায়তা করা হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগও হয় তাঁর।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নানা বুঝতে পারেন, একবারের অর্থসহায়তা দিয়ে কৃষক পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তাঁদের প্রয়োজন স্থায়ী সহায়তা, জীবিকার সুযোগ এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপদ ব্যবস্থা।
এই ভাবনা থেকেই মারাঠি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ‘নাম ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন নানা পাটেকর। কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, জলাধার পুনরুদ্ধার ও গ্রামীণ উন্নয়নও সংগঠনটির কাজের অংশ হয়ে ওঠে।

নাম ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মহারাষ্ট্রে ২ হাজার ২৪৬টি পানির উৎস পুনরুদ্ধার এবং ১৭৮টি নদী পুনরুজ্জীবনের কাজ করেছে সংগঠনটি। এসব উদ্যোগে ৭৭ লাখের বেশি কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থাৎ, নানা পাটেকরের মানবিক কাজ কেবল ব্যক্তিগতভাবে কাউকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করার মধ্যে আটকে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে তা কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি উদ্যোগে পরিণত হয়। নানা পাটেকরের কৃষকদের প্রতি এই দায়বোধের পেছনে তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শৈশব থেকেই আর্থিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে।
নিজের অভাবের দিন ভুলে যাননি
রিডার্স ডাইজেস্টে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাসে ৩৫ টাকা ও একবেলা খাবারের বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন তিনি। কলেজে পড়ার সময় জেব্রা ক্রসিং এঁকেও আয় করেছেন।
অভাবের সেই দিনগুলোই হয়তো তাঁকে সাধারণ মানুষের কষ্ট বুঝতে অন্যদের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল করে তুলেছিল। জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও সেই সময়ের কথা ভুলে যাননি নানা। বরং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নিজের অতীতের কথা বলেছেন অকপটে।
অভিনয়ে সাফল্য পাওয়ার পর তাঁর হাতে এসেছে অর্থ, সম্মান ও জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি। কিন্তু জীবনযাপনে সেই সাফল্যের বড় কোনো প্রদর্শন ছিল না। দামি গাড়ি, বিলাসী জীবন কিংবা তারকাসুলভ জাঁকজমকের চেয়ে সাধারণ জীবনযাপনেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি।
২০১৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, দামি গাড়ি কেনার পেছনে এক কোটি রুপি খরচ করার চেয়ে সেই অর্থ দিয়ে কোনো কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো তাঁর কাছে বেশি অর্থবহ।

‘রাগী’ নানা আসলে কেমন ছিলেন?
নানা পাটেকরের ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক নিয়েও কথা বলেছেন রণবীর পুষ্প। অভিনয়জীবনে তাঁর তীব্র অভিব্যক্তি ও রাগী চরিত্র দর্শকের কাছে খুব পরিচিত। ব্যক্তিজীবনেও নানা সহজে রেগে যেতেন, এমন ধারণা প্রচলিত ছিল।
তবে রণবীরের দাবি, নানা অকারণে রেগে যেতেন না। অন্যায়, দায়িত্বহীনতা কিংবা অসচেতনতা দেখলে প্রতিবাদ করতেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনাও তুলে ধরেছেন তিনি।
রণবীর জানান, একবার এক ব্যক্তিকে গাড়ি থেকে রাস্তায় একটি বোতল ছুড়ে ফেলতে দেখেছিলেন নানা। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামিয়ে নিজেই বোতলটি তুলে নেন। পরে ট্রাফিক সিগন্যালে ওই ব্যক্তির গাড়ির পাশে গিয়ে তাঁকে জানালা খুলতে বলেন।
এরপর নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেন নানা। রণবীরের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ওই ব্যক্তিকে প্রশ্ন করেছিলেন, ভারতকে পরিষ্কার রাখবে কে? গান্ধীজি চলে গেছেন, কিন্তু তুমি তো এখনো এই পৃথিবীতে আছ। দেশ পরিষ্কার রাখা কি তোমার দায়িত্ব নয়? নানা এমনও বলেছিলেন, তাঁর গাড়িটিকে যদি ডাস্টবিন ধরে সেই বোতলটি ভেতরে ছুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে কেমন লাগবে?
প্রচারের চেয়ে কাজেই বিশ্বাস
নিজের দাতব্য কাজ নিয়ে প্রচার করতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না নানা পাটেকর। রিডার্স ডাইজেস্টের সেই সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানুষের জন্য এত কিছু করার পরও কেন প্রচার করেন না। উত্তরে নানা বলেছিলেন, অন্যরা দীপাবলিতে আতশবাজি ফোটান, মিষ্টি কেনেন। তাঁর কাছে অসহায় মানুষকে সাহায্য করাই ছিল দীপাবলির আনন্দ। অন্যের জন্য কাজ করেই তিনি আনন্দ পেতেন।
তাঁর এই মানসিকতার প্রতিফলন পাওয়া যায় কৃষকদের জন্য গড়ে তোলা উদ্যোগেও। ব্যক্তিগতভাবে অর্থসহায়তা দিয়ে শুরু হলেও পরে কাজের পরিধি বাড়িয়েছেন। কৃষকদের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি পানি ও জীবিকার মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধানেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত নবভারত টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নাম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মহারাষ্ট্রে ২ হাজার ৬৪১ জনের বেশি কৃষকের বিধবা স্ত্রী আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। কারও জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কাউকে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালেও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নানা। গত মে মাসে নাগপুরে পানি সংরক্ষণবিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে নাম ফাউন্ডেশনের সভাপতি হিসেবে অংশ নেন তিনি। সেখানে তাঁর বক্তব্যেও পানি সংরক্ষণ নিয়ে মানুষের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের বিষয়টি উঠে আসে।
পর্দার আলো ছাড়িয়ে মানুষের পাশে নানা
নানা পাটেকরের পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে মূলত একজন শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবেই। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘আব তক ছাপ্পান’ কিংবা ‘ওয়েলকাম’, প্রতিটি ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে নিজের অভিনয়ক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও পদ্মশ্রীসহ পেয়েছেন নানা স্বীকৃতি।
তবে পর্দার বাইরের নানা পাটেকরের গল্পটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৩ বছর বয়সে মাসে ৩৫ টাকা আয় করা সেই কিশোর পরবর্তী জীবনে কোটি রুপির সম্পদ বা তারকাখ্যাতির চেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
কৃষকের আত্মহত্যার খবর দেখে গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলা থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, পরে নাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কাজ, নানা পাটেকরের মানবিকতার এই অধ্যায় তাঁর অভিনয়জীবনের বাইরের একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
তাই নানা পাটেকরকে মনে রাখার তালিকায় শুধু তাঁর বিখ্যাত চরিত্র, সংলাপ কিংবা পুরস্কার থাকবে না। মহারাষ্ট্রের অসহায় কৃষক পরিবারগুলোর কাছেও তিনি থেকে যাবেন এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি তাঁদের সংকটকে দূর থেকে দেখেননি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।







