ছোটবেলায় শরীর নিয়ে কটূক্তি শুনেছেন, অভিনয়ে আসার পরও কমেনি সেই চাপ। মাত্র ২২ বছর বয়সে ‘টাইটানিক’ তাঁকে এনে দেয় বিশ্বজোড়া খ্যাতি। কিন্তু সেই খ্যাতির আড়ালেও ছিল একাকিত্ব, মানসিক চাপ ও ব্যক্তিজীবনের নানা টানাপোড়েন। এরপরও ‘রোজ’ চরিত্রে আটকে থাকেননি কেট উইন্সলেট। একের পর এক ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ৫ অক্টোবর ইংল্যান্ডের রিডিংয়ে জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রী আজ ৫১ বছরে পা দিয়েছেন। জন্মদিনে ফিরে দেখা তাঁর দীর্ঘ অভিনয়যাত্রা।
কেট উইন্সলেটের অভিনয় জীবন শুরু
কেট উইন্সলেট এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে অভিনয় ছিল জীবনের অংশ। তাঁর বাবা রজার উইন্সলেট ও মা স্যালি দুজনই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নানা-নানিও থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং রিডিং রিপার্টরি থিয়েটার পরিচালনা করতেন। তবে পরিবারটি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিল না। সংসার চালাতে কেটের বাবাকে অভিনয়ের পাশাপাশি নানা কাজ করতে হতো। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্কুলের মঞ্চে অভিনয় করেন কেট। ১১ বছর বয়সে ভর্তি হন রেডরুফস থিয়েটার স্কুলে। সেখান থেকেই বিজ্ঞাপন, মঞ্চ ও টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন।

ছোটবেলা থেকেই শরীর নিয়ে মানুষের মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে কেটকে। ওজন বেশি হওয়ায় স্কুলে নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার হতেন তিনি। সহপাঠীরা তাঁকে ‘ব্লাবার’ বলে ডাকত।
অভিনয়ে আসার পরও পরিস্থিতি বদলায়নি। অভিনয় নিয়ে আলোচনার আগেই শরীর নিয়ে মন্তব্য শুনতে হতো তাঁকে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত কঠোর ডায়েট করতেন কেট। একপর্যায়ে প্রায় না খেয়েও থাকতেন। পরে জানিয়েছেন, সেই সময় আয়নায় নিজেকেই চিনতে পারতেন না।
সময়ের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর শক্তির জায়গা হয়ে ওঠে। নারীর শরীর, বয়স ও সৌন্দর্য নিয়ে প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে কেট বরাবরই নিজের অবস্থান জানিয়েছেন।
স্যান্ডউইচের দোকান থেকে ‘হেভেনলি ক্রিয়েচার্স’
১৯৯৪ সালে পিটার জ্যাকসনের ‘হেভেনলি ক্রিয়েচার্স’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান কেট। মঞ্চ ও টেলিভিশনে কাজ করলেও এই ছবিই তাঁকে চলচ্চিত্রে পরিচিত করে। অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার সময় কেট একটি স্যান্ডউইচের দোকানে কাজ করছিলেন। ফোনে খবর পাওয়ার পর স্যান্ডউইচ ফেলে বাসে করে বাড়ি ফেরেন তিনি। পরিবারকে জানান, ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন।
এরপর ১৯৯৫ সালে আসে ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’। এমা থম্পসন ও হিউ গ্রান্টের সঙ্গে অভিনয় করে মাত্র ২০ বছর বয়সেই অস্কারে মনোনয়ন পান কেট। তখনই বোঝা যায়, অভিনয় দিয়েই নিজের জায়গা তৈরি করতে চান তিনি।
‘টাইটানিক’ বদলে দিল জীবন
১৯৯৭ সালে জেমস ক্যামেরনের ‘টাইটানিক’ কেটের জীবন বদলে দেয়। রোজ ডিউইট বুকাটার চরিত্রে তাঁর বিপরীতে ছিলেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর জ্যাক ডসন। ছবিটি ব্যবসাসফল হওয়ার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও জায়গা করে নেয়। কেট হয়ে ওঠেন বিশ্ব তারকা। রোজ চরিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে প্রথম অস্কার মনোনয়নও পান তিনি।
তবে রাতারাতি পাওয়া এই খ্যাতি সব সময় আনন্দের ছিল না। ‘টাইটানিক’-এর পর পাপারাজ্জিদের নজরদারি, ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার চর্চা ও গণমাধ্যমের চাপ সামলাতে হয়েছে তাঁকে। কেট জানিয়েছেন, পাপারাজ্জিরা তাঁকে অনুসরণ করত। তাঁর ফোনে আড়ি পাতার চেষ্টা করা হতো, এমনকি আবর্জনার ঝুড়িও তল্লাশি করা হতো। স্থানীয় দোকানদারদের কাছ থেকেও তাঁর কেনাকাটা সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হতো।

সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কেট বলেছিলেন, ‘এটা ছিল একেবারেই ভয়ংকর।’ ‘টাইটানিক’-এর শুটিংয়ের সময়ও শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো অবস্থায় ছিলেন না তিনি। ছবির অভিজ্ঞতা অসাধারণ হলেও মুক্তির পর যে বিশাল খ্যাতি আসে, তার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।
‘টাইটানিক’-এর পর একই ধরনের বড় বাজেটের ছবিতে অভিনয় না করে ভিন্ন পথ বেছে নেন কেট। ‘হোলি স্মোক! কুইলস ‘ইটারনাল সানশাইন অব দ্য স্পটলেস মাইন্ড’, ‘ফাইন্ডিং নেভারল্যান্ড’ ও ‘লিটল চিলড্রেন’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।
ইটারনাল সানশাইন অব দ্য স্পটলেস মাইন্ড’-এ ক্লেমেন্টাইন ক্রুসজিনস্কি চরিত্রে প্রশংসা পান কেট। ২০০৮ সালের ‘রেভল্যুশনারি রোড’-এ আবারও লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর সঙ্গে জুটি বাঁধেন। এবার তাঁদের গল্প ছিল দাম্পত্যের টানাপোড়েন ঘিরে।
কেটের ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘দ্য রিডার’। এতে হানা শ্মিৎজ চরিত্রে অভিনয় করে ২০০৯ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে অস্কার জেতেন তিনি। একই বছর ‘রেভল্যুশনারি রোড’ ও ‘দ্য রিডার’-এর জন্য গোল্ডেন গ্লোবও পান।
এর আগে ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি, টাইটানিক, আইরিস, ইটারনাল সানশাইন অব দ্য স্পটলেস মাইন্ড’ ও ‘লিটল চিলড্রেন’ এর জন্য অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিলেন কেট।
তাঁর অভিনয়ের বড় শক্তি চরিত্রের অসম্পূর্ণতাকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলা। তাঁর চরিত্ররা ভুল করে, ভালোবাসে, ভেঙে পড়ে, ঈর্ষা করে, আবার অপরাধবোধেও ভোগে। তাই তাঁর অভিনীত চরিত্র গুলোকে অনেক সময় পর্দার মানুষ মনে হয় না, মনে হয় পরিচিত কোনো মানুষকে দেখছি।
কেট উইন্সলেট কেন বয়সকে ভয় পান না
কেট উইন্সলেট বয়সকে লুকানোর বিষয় হিসেবে দেখেননি। নিজের মুখের বলিরেখা নিয়েও গর্বিত তিনি। তাঁর মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীরা আরও সুন্দর ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। মুখের রেখা গুলো শুধু বয়সের চিহ্ন নয়, জীবনের অভিজ্ঞতারও গল্প বলে। ৪০ পেরোনো নারীদের নিয়েও কেটের অবস্থান স্পষ্ট। তাঁর মতে, এই বয়স পতনের শুরু নয়; বরং এ সময় নারীরা আরও শক্তিশালী হন, নিজের কথা স্পষ্টভাবে বলতে শেখেন এবং অন্যের মতামত নিয়ে কম ভয় পান।
২০২১ সালের ‘মেয়ার অব ইস্টটাউন’-এ ছোট শহরের গোয়েন্দা মেয়ার শিহান চরিত্রে অভিনয় করে আবারও দর্শক ও সমালোচকদের চমকে দেন কেট। চরিত্রটি ছিল ক্লান্ত, জটিল ও ব্যক্তিগত সমস্যায় জর্জরিত। হলিউডের প্রচলিত গ্ল্যামারাস নারী গোয়েন্দার ধারণা থেকে একেবারেই আলাদা এই মেয়ার।
এই চরিত্রের জন্য গোল্ডেন গ্লোব জেতেন কেট। এর আগে ‘মিলড্রেড পিয়ার্স’-এর জন্যও গোল্ডেন গ্লোব ও এমি পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। আই অ্যাম রুথ-এর জন্য ২০২৩ সালে বাফটা টেলিভিশন পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান।
অভিনেত্রী থেকে প্রযোজক এবার পরিচালক
২০২৪ সালের ‘লি’ ছবিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফটো সাংবাদিক লি মিলারের চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাও করেন কেট। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাতেও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা তৈরি করেছেন তিনি।

এরপর পরিচালনায়ও পা রাখেন কেট। ‘গুডবাই জুন’ ছবিতে পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা তিন ভূমিকাতেই কাজ করেছেন তিনি। ছবিতে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন হেলেন মিরেন, টিমোথি স্পল ও টনি কোলেট। কেটের কাছে বয়স মানে থেমে যাওয়া নয়; বরং জীবনের নতুন পর্যায়ে নতুন কিছু শুরু করার সুযোগ।
তিন বিয়ে তিন সন্তান
কেটের ব্যক্তি জীবনও কম আলোচিত নয়। ১৯৯৮ সালে সহকারী পরিচালক জিম থ্রিপলটনকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের মেয়ে মিয়া থ্রিপলটনের জন্ম ২০০০ সালে। ২০০১ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। ২০০৩ সালে পরিচালক স্যাম মেন্ডেসকে বিয়ে করেন কেট। তাঁদের ছেলে জো একই বছর জন্ম নেয়। ২০১০ সালে তাঁদের সম্পর্কের ইতি ঘটে এবং পরের বছর বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
২০১২ সালে কেট বিয়ে করেন এডওয়ার্ড অ্যাবেল স্মিথকে, যিনি একসময় ‘নেড রকনরোল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের ছেলে বেয়ার জন্ম নেয় ২০১৩ সালে। তিন সন্তানকে নিয়ে পরিবার কেটের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর মেয়ে মিয়া এখন নিজেও অভিনয় করছেন। অর্থাৎ যে পরিবার থেকে কেটের অভিনয়জীবনের শুরু, পরবর্তী প্রজন্মেও সেই ধারাটি এগিয়ে চলছে।
৭৯০ কোটি টাকার সম্পদ
সেলিব্রিটি নেট ওয়ার্থ -এর হিসাবে কেট উইন্সলেটের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৯০ কোটি টাকা।
টাইটানিক, দ্য রিডার, রেভল্যুশনারি রোড, ফাইন্ডিং নেভারল্যান্ড’ ও ‘স্টিভ জবস-এর মতো ছবিতে অভিনয়ের পারিশ্রমিক, টেলিভিশনের কাজ, প্রযোজনা ও সম্পত্তি সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর এই সম্পদ।
তবে কেট উইন্সলেটের গল্প কেবল অর্থ, পুরস্কার কিংবা তারকাখ্যাতির নয়। যে মেয়েটি একসময় নিজের শরীর নিয়ে সহপাঠীদের কটূক্তি সহ্য করেছেন, সেই মেয়েটিই পরে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন নিজের নিয়মে।
টাইটানিক -এর রোজ তাঁকে বিশ্বজোড়া পরিচিতি দিয়েছিল, কিন্তু রোজের গণ্ডি পেরিয়ে কেট নিজেকে প্রমাণ করেছেন আরও বহু চরিত্রে। তিন দশকের বেশি সময় পরও তাঁর গল্প শেষ হয়নি। বয়সের সঙ্গে বদলেছে চরিত্র, বদলেছে কাজের ধরন; বদলায়নি নতুন কিছু করার আগ্রহ। ৫১তম জন্মদিনে কেট উইন্সলেটের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো এখানেই সময় তাঁকে শুধু বয়সে বড় করেনি, নতুন করে নিজেকে আবিষ্কারের সুযোগও দিয়েছে।










