উপন্যাস থেকে সিনেমা
“মা আজ মারা গেছেন। কিংবা হয়তো গতকাল, আমি জানি না। বৃদ্ধাশ্রম থেকে একটা টেলিগ্রাম পেয়েছি: “মা প্রয়াত। আগামীকাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। আপনার একান্ত বিশ্বস্ত।” এর কোনো মানে হয় না। এটা গতকালও হতে পারে।“ এই কথাগুলো দিয়ে শুরু হয় বিখ্যাত ফরাসী উপন্যাসিক আলব্যের কামুর ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ উপন্যাস । এই উপন্যাসকেই চলচ্চিত্রে রূপ দিয়েছেন ফরাসি পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ওজোন।

এই চলচ্চিত্রটি ইতোমধ্যেই আলব্যের কামু ভক্ত ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলচ্চিত্রটির প্রেক্ষাপট ১৯৪০-এর দশকের ফরাসি আলজেরিয়া, যদিও এর শুটিং হয়েছে মরক্কোয়। সাদা-কালো নির্মাণশৈলীতে তৈরি এই সিনেমাটি নাটক, মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী ঘরানার মিশেলে এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।

মূল চরিত্র মোরসোর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বেঞ্জামিন ভয়েসিন, আর মারি চরিত্রে রয়েছেন রেবেকা মার্দার। গল্পটি এগিয়েছে এক আবেগহীন, নির্লিপ্ত মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে, যিনি মায়ের মৃত্যুর পরও কোনো গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেন না। তিনি একজন এমন মানুষ, যিনি সমাজের প্রচলিত আবেগ ও নৈতিকতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেন না। তার মায়ের মৃত্যু, প্রেম, সহিংসতা-সবকিছুতেই তার প্রতিক্রিয়া একরকম শূন্য ও নির্লিপ্ত। এই আবেগহীনতাই তাকে সমাজের কাছে ‘অপর’ করে তোলে। ঘটনাক্রমে সমুদ্র সৈকতে তিনি বেখেয়ালবশত এক হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তিনি গুলি করেন এক আরব মানুষকে। গুলি করার যথাযথ কারণ ছাড়াই হত্যাকান্ডটি ঘটে। এরপর এর বিচারপ্রক্রিয়ায় তার অনুভূতিহীন আচরণই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তিনি চুপ করেই থাকেন পুরো বিচার প্রক্রিয়ায়।
ভিজ্যুয়াল স্টাইলে প্রশ্ন
চলচ্চিত্রটি জীবনের অর্থহীনতা, আবেগের বিচ্ছিন্নতা, বর্ণবৈষম্য এবং ঔপনিবেশিক বাস্তবতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। বিশেষ করে বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে থাকা বৈষম্যকেও নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে এই নির্মাণ। যদিও এই বিস্তৃত পরিসর উপন্যাসেও কম।
সিনেমাটির ভিজ্যুয়াল স্টাইল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাদা-কালো চিত্রগ্রহণ, তীব্র গরমের আবহ এবং নীরবতার ব্যবহার পুরো গল্পকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করে তুলেছে। তবে এখানে আলো ও অন্ধকার, উষ্ণতা ও নীরবতা-সবকিছুই যেন এক দার্শনিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
অ্যাবসার্ড দর্শন যা বলে
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ শুধু একটি সাহিত্য অবলম্বিত সিনেমা নয়, বরং এটি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এক ক্লাসিক গল্পের নতুন ব্যাখ্যা। কারণ এটি মানুষের অস্তিত্ব, অনুভূতি এবং অর্থহীনতার গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান করে যা ‘অ্যাবসার্ডিজম’-এর এক শক্তিশালী চিত্রায়ণ। গল্পের নায়কের মায়ের মৃত্যু, প্রেম, তাঁর চোখে দেখা নানা সহিংসতা-সবকিছুতেই তার প্রতিক্রিয়া শূন্য ও নির্লিপ্ত। এই আবেগহীনতাই তাকে সমাজের কাছে ‘অপর’ করে তোলে।

অ্যাবসার্ড দর্শনের মূল ধারণা হলো-মানুষ অর্থ খোঁজে, কিন্তু বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সেই অর্থ দিতে অক্ষম। মোরসোর জীবন সেই দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি। তিনি কোনো ভান করেন না, মিথ্যা আবেগ দেখান না, এমনকি নিজের অপরাধেরও যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন না। হত্যা করা নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা,’এটা সূর্যের কারণে হয়েছে’। এটি ধরনের অস্তিত্ববাদী সত্যকে প্রকাশ করে, যেখানে কাজের পেছনে কোনো গভীর নৈতিক কারণ নেই, আছে শুধু পরিস্থিতি ও অনুভূতির অনুপস্থিতি।
চলচ্চিত্রে নতুন ব্যাখ্যা
তবে চলচ্চিত্রটি শুধু ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ঔপনিবেশিক বাস্তবতা ও বর্ণবৈষম্যের প্রশ্নও তোলে। মোরসোর হাতে নিহত ব্যক্তি, যাকে দীর্ঘদিন ধরে শুধু আরব বলে ‘অপর’ হিসেবে দেখা হয়েছে, সেই পরিচয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক সত্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, মোরসো কেবল একজন ব্যক্তি নয়-তিনি একটি ক্ষমতাবান ব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে সহানুভূতির অভাবই স্বাভাবিক।

তাই সিনেমাটি আমাদের বাধ্য করে ভাবতে-মানবজীবনের অর্থ কি সত্যিই আছে, নাকি আমরা শুধু অর্থ খোঁজার এক অন্তহীন প্রচেষ্টায় আটকে আছি? আলব্যের কামুর ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ উপন্যাস এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। উত্তর দেয় না চলচ্চিত্রটিও; বরং আমাদের সেই প্রশ্নের মধ্যেই ফেলে রেখে যায় যা জীবন-জগত কি অ্যাবসার্ড?


