মসজিদ-আল-হারাম এর ইতিহাস ….
মক্কার বুকের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে এমন এক স্থাপনা, যার দিকে মুখ ফিরিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নামাজ আদায় করেন, মসজিদুল হারাম। এই মসজিদের কেন্দ্রবিন্দু হলো পবিত্র কাবাঘর। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, কাবা প্রথম নির্মাণ করেন হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)। তবে তারও আগে এই স্থান ইবাদতের জন্য নির্ধারিত ছিল, এমন বিশ্বাসও মুসলিম ঐতিহ্যে পাওয়া যায়।
ইসলাম আগমনের আগে কাবাঘর আরবদের কাছে ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল, কিন্তু সেখানে মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। নবী মুহাম্মদ (সা.) যখন মক্কা বিজয় করেন (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ), তখন তিনি কাবা থেকে সব মূর্তি অপসারণ করেন এবং একত্ববাদের ভিত্তিতে এই স্থানকে পুনরায় পবিত্র ইবাদতকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই সময় থেকে মসজিদুল হারাম ইসলামের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
খোলা প্রাঙ্গণ থেকে সুসংগঠিত স্থাপনায় রূপান্তর
প্রথমদিকে মসজিদুল হারাম ছিল খোলা প্রাঙ্গণবিশিষ্ট। ধীরে ধীরে খলিফাদের আমলে এর সম্প্রসারণ শুরু হয়। হজরত উমর (রা.) ও হজরত উসমান (রা.)-এর সময় মসজিদের সীমানা বাড়ানো হয় এবং আশপাশের ঘরবাড়ি ক্রয় করে জায়গা প্রশস্ত করা হয়। উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকেরা মসজিদে স্থাপত্যিক সৌন্দর্য যোগ করেন, খিলান, স্তম্ভ ও ছাদ নির্মাণের মাধ্যমে এটি আরও সুশৃঙ্খল রূপ পায়।
উসমানি আমলে মসজিদের সৌন্দর্য ও কাঠামোতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। মিনার নির্মাণ, মার্বেল পাথরের ব্যবহার এবং কারুকাজ মসজিদটিকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তোলে। তবে আধুনিক যুগে সৌদি আরব সরকারের ব্যাপক সম্প্রসারণ প্রকল্প মসজিদুল হারামকে আজকের বিশাল রূপ দিয়েছে। এখন লক্ষাধিক হাজি ও ওমরাহ পালনকারী একসঙ্গে এখানে ইবাদত করতে পারেন। তাওয়াফের জন্য প্রশস্ত প্রাঙ্গণ, একাধিক তলা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সবই আধুনিক উন্নয়নের অংশ।
মসজিদুল হারামের ইতিহাস শুধু স্থাপত্যের পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এটি ঈমান, ত্যাগ ও ঐক্যের প্রতীক। কাবাকে ঘিরে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য দৃশ্যমান হয়, ভাষা, বর্ণ, জাতি ভিন্ন হলেও সবার দিক এক, কাবার দিকে। এই ঐক্যই মসজিদুল হারামের প্রকৃত সৌন্দর্য।
যুগে যুগে এর দেয়াল বদলেছে, প্রাঙ্গণ বড় হয়েছে, কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত, এই স্থান মুসলমানদের হৃদয়ের কেন্দ্র। পৃথিবীর যেখানেই কেউ দাঁড়াক, তার কিবলা একটাই, মসজিদুল হারাম।

