৮০’র দশকের এক শিল্পী
১৯৮০ সালের কথা। কিশোর এক গায়কের গান সাড়া ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশে। তার মায়াময় কিশোর কণ্ঠে তখন বুঁদ তরুণ থেকে বয়স্ক- সবাই। এই শিল্পীর নাম জুয়েল। পুরো নাম জাহিদুল ইসলাম জুয়েল। বাবা গাফফার চৌধুরী ও মা জেসমিন গাফফারের চার সন্তানের ভেতর জুয়েল ছিলেন দ্বিতীয়। সেই জুয়েল নামটি হারিয়ে গেলেও রয়ে গেছে তার গান।
শৈশব থেকেই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বড় হন জুয়েল। তাদের পৈতৃক নিবাস ছিলো বগুড়ায়। তবে ঢাকায় তার পরিবার থাকত শান্তিনগরে। সেখানেই ১৯৬৪ সালের ২৩ জানুয়ারি জন্ম নেন জুয়েল।

তার গানের গলা ছিলো সহজাত। আবেগ ও ভাবরস খুব ভালোভাবে প্রকাশ পেত তার কণ্ঠে। ১৯৮০ সালে তার প্রথম অ্যালবাম প্রকাশিত হতেই তুমুল জনপ্রিয়তা পান তিনি। তার মোলায়েম কণ্ঠ শুনলে মনে হতো যেন এক কিশোর গানে গানে বলে দিচ্ছে সে সময়ের সব কিশোর তরুণদের হৃদয়ের কথাগুলো।
জুয়েল নামটি হারিয়ে গেলেও যেথায় সে অমর
জুয়েলের ‘চলেই যদি যাবে’ গানটি শুনলে মনে হবে যেন কিশোর বয়সের প্রথম প্রেমের স্বপ্নময়তা ভাঙা বেদনাতুর বিচ্ছেদের আবেগ ঝরে পড়ছে। ‘যাই বলে যেতে নাই রে’ তে আবার রক এন্ড রোলের উচ্ছ্বাস আর বন্ধুত্বের দাবির প্রসঙ্গ আসে। জুয়েলের আরেকটি খুব জনপ্রিয় গান ছিলো তার দ্বিতীয় অ্যালবামের ‘এক ডালি ফুল।’ এই গানটি আজও এক চিরায়ত প্রেমের গান হিসেবে শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। ‘হারিয়ে গেছে আমার মা’ নামে জুয়েলের আরেকটি গানও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তার কণ্ঠের ন্যাচারাল প্যাথোস তার হাহাকারকে মূর্ত ও জীবন্ত করে তুলত। এক্ষেত্রে অবশ্য সুরকার রকেট মণ্ডল ও জাহিদ হোসেনের কথাও উল্লেখ না করলেও নয়। তাদের মর্মস্পর্শী সুরগুলো জুয়েল কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন সার্থকভাবে।
জুয়েল যে সময়টায় গান করছেন, সে সময়টায় প্রেমের ব্যাপারটা এত সহজ ছিলো না মোটেই। মাঝে মাঝে একটু দেখা, অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যোগাযোগ করতে পারা, চিঠি পাঠিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা। এসব কিছুর কারণে প্রিয় মানুষটির একটু সান্নিধ্যই ছিলো পরম আরাধ্যের। তারপরও এমন বহু সম্পর্ক আছে, যেগুলো আর পরিণয়ের রূপ নেয়নি। দুটো জীবন দুই দিকে চলে গেছে, কিন্তু মানুষগুলো কেউ কাউকে ভুলতে পারেনি কখনো।

জুয়েলের জীবনেও এসেছিল ভালোবাসা। তার ছোটবেলার এক বান্ধবীকে ভালোবেসেছিলেন তিনি। সেই অভিনেত্রী ১৯৮০ সালেই ‘সকাল সন্ধ্যা’ ধারাবাহিকে বেণু নামের চরিত্রটিতে অভিনয় করে পরিচিতি পান। জুয়েলের প্রথম অ্যালবামটিও সে বছরই প্রকাশিত হয়। দুজনই তখন স্বপ্নময় এক জীবনের দিকে এগিয়ে চলছেন। এর ভেতরই ঘটে ছন্দপতন। ‘জোনাকী জ্বলে’, ‘জন্মভূমি’-সহ বিটিভির চমৎকার কিছু নাটকের খ্যাতিমান এক প্রযোজকের সঙ্গে সেই অভিনেত্রীর সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘটনাটা তীব্র আকার ধারণ করে। এতে সেই অভিনেত্রীর পরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং প্রবাসী এক পাত্রের সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে যায়।
গানের জুয়েল হারাবে না কখনো
‘ভালোবেসে চলে যেও না’ নামে খুব হিট একটি গান ছিলো জুয়েলের। সেই গানটি সত্য হয়ে যায় তার জীবনে। জুয়েলের নেশার পরিমাণ বেড়ে যায়। আর তারপর ১৯৮৬ সালের ১৪ জানুয়ারি- এক প্রচণ্ড শীতের বিকেলে জানা যায়, জুয়েল আর নেই! গতকাল তার চলে যাওয়ার ৪০ বছর পূর্ণ হলো।
জুয়েল যখন মারা যান, তখন তার বয়স ২২ বছরও পূর্ণ হয়নি। মৃত্যুর পর তার তৃতীয় অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে তার নির্বাচিত গানের সংকলন ‘স্মরণীয় জুয়েল’ প্রকাশ করে জিগাতলার ‘ডিসকো রেকর্ডিং।’
জুয়েলের কথা আজ হয়ত অনেকেই জানেন না। তবে সে সময়ের অনেক শ্রোতাদের হৃদয়েই আজও দাগ কেটে যায় তার গান। আশির দশকের কিশোর-তরুণদের অনেকেই আজো তার গানে গানে খুঁজে ফেরেন জুয়েলকে। তাদের মানসপটে ভেসে আসে এক তরুণের মোলায়েম দরদী কণ্ঠ, যে গাইছে- ‘এক ডালি ফুল তোমার হাতে দিয়ে আমি/ বলেছিলাম ভালোবাসি/ ভালোবাসি সবচেয়ে বেশি/ শুধু তোমাকে, শুধু তোমাকে, শুধু তোমাকে…’ ।
লেখক : মাহমুদ নেওয়াজ জয়
