৬৮তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস
বাংলাদেশ সময় সোমবার সকালে অনুষ্ঠিত হয় ৬৮তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের আসর। এবারের গ্র্যামিতে ইতিহাস গড়েছেন অনেকেই। অনেকেই দিয়েছেন রাজনৈতিক বোঝাপড়ার বক্তব্য। করেছেন আমেরিকার অস্তিত্ব নিয়ে সমালোচনা। গ্র্যামিতে বিলি আইলিশ-চুরি করা জমিতে কেউই অবৈধ নয় এর মতো কথাও বলেছেন। কেন বললেন? চলুন জানি এবারের গ্র্যামির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সংক্ষেপে।
কেনড্রিক লামারের ইতিহাস নির্মাণ

মার্কিন র্যাপ তারকা কেনড্রিক লামার গ্র্যামিতে নতুন ইতিহাস গড়েছেন। এবারের আসরে সর্বোচ্চ পাঁচটি পুরস্কার জিতে ভেঙে দিয়েছেন র্যাপারদের মধ্যে সর্বাধিক গ্র্যামি জয়ের রেকর্ড। এত দিন র্যাপার জে-জেড ছিলো সর্বোচ্চ গ্র্যামি জয়ী। জে-জেডের মোট গ্র্যামি ছিল ২৫টি, তাকে ছাড়িয়ে লামার বনে গেলেন ইতিহাস। তাঁর ঝুলিতে এখন ২৭টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস। কেনড্রিক লামার- এবারের আসরে ‘সেরা র্যাপ পারফরম্যান্স’, ‘সেরা মেলোডিক র্যাপ পারফরম্যান্স’, ‘সেরা র্যাপ সং’, ‘সেরা র্যাপ অ্যালবাম ও সিজারের সঙ্গে যৌথভাবে ‘রেকর্ড অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জেতেন। আর জয়েই নিজের গলায় পড়ে নেন ইতিহাসের মালা।
স্প্যানিয়ার্ড ব্যাড বানির ইতিহাস

গ্র্যামির ইতিহাসে এই প্রথম স্প্যানিশ-ভাষী শিল্পী হিসেবে গ্র্যামিতে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ জিতলেন স্পেনের পুয়ের্তো রিকোর র্যাপার ব্যাড বানি। আলোচিত অ্যালবাম ‘ডেবি তিয়ার মাস ফোতোস’-দিয়ে এই পুরস্কার জেতেন বানি। অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার ছাড়া আরও দুটি পুরস্কার জিতেছেন বানি।
গ্র্যামিতে রাজনৈতিক বার্তা

গ্র্যামিতে উপস্থিত অনেক শিল্পী তাঁদের পোশাকের সঙ্গে ‘আইস আউট’ পিন পরিধান করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জাস্টিন বিবার ও হেইলি বিবার দম্পতি, জনি মিচেল, জর্ডান টিসন, হেলেন জে শেনের মতো তারকারা। কিউবান-আমেরিকান সংগীতশিল্পী গ্লোরিয়া এস্তেফান বলেন, ‘আমি ভীত, আমি খুব চিন্তিত। এটা অপরাধীদের গ্রেপ্তার নয়। এসব মানুষের পরিবার আছে, তারা দশক ধরে এই দেশে অবদান রেখেছে। শিশুদের কথা বলতেই হবে। শত শত শিশু ডিটেনশন সেন্টারে আছে। এটা অমানবিক।’
এবারের সেরা নবাগতশিল্পীর পুরস্কার জেতেন ২৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ গায়িকা অলিভিয়া ডিন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি একজন অভিবাসীর নাতনি হিসেবে।’

পুরস্কার জয়ের পর র্যাপার শাবুজি বলেন, ‘অভিবাসীরাই এই দেশ (আমেরিকা) বানিয়েছে। এই পুরস্কার সব অভিবাসীর সন্তানদের জন্য। যারা ভালো সুযোগের জন্য এসেছে, তারা দেশকে রঙিন করেছে।’
গ্র্যামিজয়ী আরেক শিল্পী সিজা বলেন, ‘আজ আমরা গ্র্যামি জয় উদ্যাপন করছি, আর কাউকে রাস্তায় ধরে নিয়ে গিয়েই গুলি করা হচ্ছে, এটা খুব হতাশাজনক। তবে আশা হারানো যাবে না; কারণ, যখন মনোবল হারায়, পরিবর্তন সম্ভব হয় না।’
ব্যাড বানি পুরস্কার গ্রহণ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ইমিগ্রেশন নীতির সমালোচনা করেন। ব্যাড বানি বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানোর আগে বলব, আইস আউট। আমরা পশু নই, এলিয়েন নই; আমরা মানুষ এবং আমেরিকান।’
গ্র্যামিতে বিলি আইলিশ

এ সময়ের আলোচিত ও জনপ্রিয় গায়িকা বিলি আইলিশও কথা বলছেন মঞ্চে। ‘সং অব দ্য ইয়ার’ জেতা বিলি আইলিশ পুরো অনুষ্ঠানে সবচেয়ে চমৎকার, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক বার্তাটি দিয়েছেন। বিলি আইলিশ বলেছেন, ‘নো ওয়ান ইজ ইল্লিগ্যাল অন স্টোলেন আইল্যান্ড’ মানে চুরি করা জমিতে কেউই অবৈধ নয়।এই ছোট্ট একটি বাক্যে চমৎকার করে তুলে এনেছেন আজকের আমেরিকার ঐতিহাসিক নির্মান। কিভাবে রেড ইন্ডিয়ানদের উপর দমন পীড়ন ও গণহত্যা চালিয়ে এই ভূমির আপন লোকজনদেরকেই বিতাড়িত ও প্রান্তিক করে ফেলা হয়।এমনকি আমেরিকা যে একটি সেটেলার কান্ট্রি যার অর্থনীতি সমাজ পুরোটাই অভিবাসীদের গড়া সেই বাস্তবতাও উঠে এসেছে এই ছোট্ট বাক্যে। যারা মানুষদের তাড়িয়ে দিচ্ছে তাদের নিজেদের শিকড়ও এখানের নয়।
ICE মূলত কি?
আইস হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট যা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস)-এর সবচেয়ে বড় তদন্তমূলক শাখা। এটি আমেরিকার অভিবাসন আইন বাস্তবায়ন করে এবং অবৈধ অভিবাসন সংক্রান্ত তদন্ত পরিচালনা করে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধ অভিবাসীদের অপসারণের ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা পালন করে। আইস মূল গঠিত হয় ২০০২ সালে। এর গঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপট ৯/১১-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
ট্রেভর নোয়ার হোয়াইট হাউজ কমেডি

টানা ষষ্ঠবারের মতো এবং শেষবারের মতো গ্র্যামি সঞ্চালনা করলেন ট্রেভর নোয়া। এই দক্ষিণ আফ্রিকান কমেডিয়ান গ্র্যামিতে নিজের উদ্বোধনী বক্তব্যেই সরাসরি গায়িকা নিকি মিনাজের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ব্যঙ্গ করেন। তিনি বলেন, ‘নিকি মিনাজ এখানে নেই। তিনি এখনো হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করছেন।’
গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড সম্প্রচার শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক বার্তা দিয়ে অনুষ্ঠান ও ট্রেভর নোয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, এ অনুষ্ঠান ‘দেখার অযোগ্য’ এবং নোয়া ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সিবিএস খুব সৌভাগ্যবান যে তাদের চ্যানেলে এই বর্জ্য আর প্রচারিত হচ্ছে না। ট্রেভর নোয়া যে–ই হোক না কেন, জিমি কিমেলের মতোই খারাপ। আমি হয়তো তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
দালাই লামা

এ বছরের গ্র্যামিতে ঘটেছে আরেকটি ঘটনা। ৯০ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো গ্র্যামি জিতেছেন তিব্বতি বৌদ্ধদের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা যিনি ভারতে বর্তমানে নির্বাসিত। তাঁর স্পোকেন-ওয়ার্ড অ্যালবাম ‘মেডিটেশনস: দ্য রিফ্লেকশন অব হিজ হলিনেস অব দ্য দালাই লামা’র জন্য এ পুরস্কার পান তিনি। সেরা মিউজিক্যাল ফিল্ম ক্যাটাগরিতে এবার পুরস্কার জিতেছে ‘মিউজিক বাই জন উইলিয়ামস’। তথ্যচিত্রটির প্রযোজকদের মধ্যে আছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ।
এবারও লালগালিচায় আলো ছড়িয়েছেন সংগীত তারকারা। তবে সবচেয়ে আলোচিত ছিল চ্যাপেল রোনের উপস্থিতি। লালগালিচায় অর্ধাঙ্গ অনাবৃত রেখে চমকে দেন হালের এই তরুণ গায়িকা। এ ছাড়া গানে গানে মঞ্চ মাতান রোজে, ব্রুনো মার্স, লেডি গাগা, সাবরিনা কার্পেন্টার, জাস্টিন বিবার, টেইলর, দ্য ক্রিয়েটররা।
সব মিলিয়ে এবারের গ্র্যামি হয়ে উঠেছে নতুন ইতিহাস রচনার ক্ষেত্র। মানবিকতার মঞ্চ। শিল্পীরা যে কেবল শিল্পই করেন না তথা শিল্পের জন্যই শিল্প নয় তা প্রমাণ করেছেন। শিল্প যে মানবিকতার পক্ষের এক জোড়ালো হাতিয়ার তা উঠে এসেছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণভাবে। এবারের গ্র্যামি তাই হয়ে থাকবে ইতিহাসে অনন্য।


