খেলাধুলা ও ব্লকবাস্টারভিত্তিক সিনেমা
এই জুন মাসে বিশ্বব্যাপী অনেক ব্যস্ততা কারণ চারিদিকে চলছে ফুটবল বিশ্বকাপের আমেজ। তবে বাংলাদেশ সময়ে খেলাগুলোর প্রায় সবগুলোই গভীর রাতে যা বড়দের জন্যও বেশ প্রতিকূল সময়। ফলে অফিস কিংবা কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে আপনার সন্তানের সাথে ফুটবল খেলা দেখা সম্ভাবনা একেবারেই শূন্যের কোঠায়। তাহলে কি দেখে সময় কাটাবেন? সন্তানের সাথে একটু হৃদ্যতাপূর্ণ সময় কাটাতে দেখতে পারেন এই ৫টি শিশুতোষ চলচ্চিত্র । আপনি যদি আর্জেন্টিনা ভক্ত হন তাহলে দেখাতে পারেন এমি মার্তিনেজকে নিয়ে কার্টুন তথ্যচিত্র। এছাড়াও আছে ছোটদের জন্য ব্লকবাস্টার সিনেমা। চলুন দেখে নেয়া যাক পাঁচটি সিনেমার টুকিটাকি।
এমি মার্তিনেজ: দ্য কিড হু স্টপস টাইম- Emi Martinez: The Kid Who Stops Time

বিশ্বকাপের এই আমেজ উপলক্ষে ফুটবলপ্রেমী তরুণ-তরুণীদের জন্য আর্জেন্টাইন তারকা এমি মার্তিনেজকে নিয়ে নির্মিত এই নতুন প্রামাণ্যচিত্রটি বেশ উপভোগ্য হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের সেরা গোলরক্ষকদের একজন হিসেবে বিবেচিত মার্তিনেজকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে রয়েছে অ্যানিমেশন (যার শিল্পী আর্জেন্টাইন কার্টুনিস্ট লিনিয়ার্স), পাশাপাশি মার্তিনেজ, তাঁর পরিবার, বন্ধু, কোচ ও সতীর্থদের আবেগঘন ও তথ্যসমৃদ্ধ সাক্ষাৎকার। এছাড়াও ব্যবহৃত হয়েছে নানা আর্কাইভ ফুটেজ।
চলচ্চিত্রটিতে ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তিদেরও উপস্থিতি রয়েছে। ইংলিশ ক্লাব অ্যাস্টন ভিলার গোলরক্ষক মার্তিনেজ ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে নাটকীয় জয়ে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
অধ্যবসায়, আত্মনিবেদন এবং অন্যদের অবমূল্যায়ন সত্ত্বেও নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলার গল্প নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের শুরু হয় মার্তিনেজের শৈশব থেকে। তখন থেকেই তিনি একদিন বিখ্যাত গোলরক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। যে কোনো তরুণ ক্রীড়াবিদের জন্য এটি হতে পারে অনুপ্রেরণামূলক এক শিক্ষা, আর ফুটবলপ্রেমী শিশুরা এখানে খুঁজে পাবে প্রচুর উৎসাহ ও প্রেরণা।
চলচ্চিত্রটির অ্যানিমেশন অংশগুলো কল্পনাময় এবং খানিকটা অদ্ভুতও বটে। সেখানে দেখা যায়, ছোটবেলার মার্তিনেজের নাভির জায়গায় রয়েছে এমন একটি সুইচ, যা চাপ দিলে সময় থেমে যায়। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন গুস্তাভো কোভা। এর চিত্রনাট্য লিখেছেন হার্নান ক্যাসশিয়ারি এবং ক্রিশ্চিয়ান ব্যাসিলিস। এটি দেখতে পারবেন ওটিটি প্লাটফর্ম প্রাইম ভিডিওতে।
গোট- GOAT

চলছে এনবিএ ফাইনাল। এই সময়ে শিশুদের জন্য এই নতুন অ্যানিমেটেড কমেডি চলচ্চিত্রটি দেখার আদর্শ সময়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র উইল নামের একটি ছাগল, (এতে কণ্ঠ দিয়েছেন ক্যালেব ম্যাকলাফলিন), যার সবচেয়ে বড় আবেগ ‘রোরবল’ নামের একটি খেলা। রোরবল অনেকটা বাস্কেটবলের মতো, তবে অনেক বেশি দ্রুতগতির, আর এতে অংশ নেয় বিভিন্ন প্রাণী। ছোটবেলা থেকেই উইল রোরবলের ভক্ত, আর তার প্রিয় দল নিজ শহরের ভাইনল্যান্ড থর্নস। সবাই তাকে বলে সে খুবই ছোট ও খাটো, কিন্তু সেই কথায় সে কখনোই দমে যায় না।
একদিন পেশাদার খেলোয়াড় মেইন অ্যাট্র্যাকশন (কণ্ঠ দিয়েছেন অ্যারন পিয়ের)-যে একটি ঘোড়া- তার সঙ্গে উইলের বাস্কেট ছোড়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর থর্নস দলের মালিক ফ্লো (জেনিফার লুইস) তাকে সুযোগ দেন তার বিপর্যস্ত দলটিতে নতুন উদ্যম আনতে। কিন্তু দলের তারকা খেলোয়াড় এবং উইলের আদর্শ জেট ফিলমোর (গ্যাব্রিয়েল ইউনিয়ন) এই নতুন ও খাটো খেলোয়াড়কে গুরুত্ব দিতে চান না। দলে আরও রয়েছে একটি জিরাফ, যার কণ্ঠ দিয়েছেন এনবিএ কিংবদন্তি স্টিফেন কারি; তিনি চলচ্চিত্রটির একজন প্রযোজকও।
এটি মূলত একজন অবহেলিত ও সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়ের সাফল্যের গল্প। একটি ক্লাসিক ‘আন্ডারডগ’ কাহিনি। চলচ্চিত্রটির ভিজ্যুয়াল স্টাইল অত্যন্ত স্বতন্ত্র ও প্রাণবন্ত। কণ্ঠশিল্পীদের তালিকায় আরও আছেন প্যাটন অসওয়াল্ট, নিক ক্রল, নিকোলা কফলান, জেনিফার হাডসন ডেভিড হারবার।
চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন টাইরী ডিলিহে যিনি Bob’s Burgers-এর জন্য পরিচিত এবং অ্যাডাম রোজেট (The Wild Robot-এর স্টোরি আর্টিস্ট)। চিত্রনাট্য লিখেছেন অ্যারন বুচসবাউম এবং টেডি রিলে, যিনি Fairfax অ্যানিমেটেড সিরিজের স্রষ্টাদের একজন। এটি দেখতে পারবেন ওটিটি প্লাটফর্ম নেটফ্লিক্সে।
স্পাইজ ইন ডিসগাইজ- Spies in Disguise

২০১৯ সালের এই অ্যাকশন-কমেডি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে ল্যান্স স্টার্লিং (কণ্ঠ দিয়েছেন উইল স্মিথ) একজন আত্মবিশ্বাসী, স্টাইলিশ এবং কিছুটা অহংকারী গোপন এজেন্ট, যিনি প্রায় অসম্ভব সব কাজই করতে পারেন। তিনি ভয়ংকর ঘাতকদের পরাস্ত করেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গোপন মিশন সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে, তিনি নিজের সংস্থার তরুণ প্রযুক্তিবিদ ওয়াল্টারকে (কণ্ঠ দিয়েছেন টম হল্যান্ড) তেমন গুরুত্ব দেন না। ওয়াল্টার সহিংসতাকে ঘৃণা করে এবং পৃথিবীতে শান্তি দেখতে চায়। তাই তার আবিষ্কারগুলোতে প্রাণঘাতী অস্ত্রের বদলে থাকে ঝিলমিল গ্লিটার আর রংধনুর ছোঁয়া।
একসময় স্টার্লিংকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ফাঁসানো হয় এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে তিনি ওয়াল্টারের সাহায্য চান, যাতে তাকে অদৃশ্য করে দেওয়া যায় এবং তিনি প্রকৃত অপরাধী কিলিয়ানকে (কণ্ঠ দিয়েছেন বেন মেন্ডেলসোহন) খুঁজে বের করতে পারেন। কিন্তু ওয়াল্টারের তৈরি ওষুধের কারণে স্টার্লিং অদৃশ্য হওয়ার বদলে একটি নীল রঙের কবুতরে পরিণত হন। ফলে পাখির রূপেই তাকে মিশন সম্পন্ন করতে এবং নিজের নামের কলঙ্ক মুছতে হয়। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে ওয়াল্টারের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, আর শেষ পর্যন্ত তিনি আবার মানুষে রূপান্তরিত হন।
অদ্ভুত হলেও গল্পটির মূল ধারণা বেশ মজার এবং এটি ‘অদ্ভুত জুটি’ভিত্তিক বন্ধু-অভিযানের চলচ্চিত্রে নতুনত্ব এনে দেয়।
এটি পরিচালনা করেছেন নিক ব্রুনো এবং ট্রয় কোয়ান। চিত্রনাট্য লিখেছেন ব্র্যাড কোপল্যান্ড (ফার্দিনান্দ) এবং লয়েড টেলর (নিমোনা)। এটি দেখতে পারবেন ওটিটি প্লাটফর্ম প্রাইম ভিডিওতে।
টোয়িস্টার্স- Twisters

এটি দুর্যোগভিত্তিক চলচ্চিত্র। এটি ১৯৯৬ সালের ক্লাসিক চলচ্চিত্র টুইস্টার-এর একটি স্বতন্ত্র সিক্যুয়েল হিসেবে নির্মিত হয়েছে।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন প্রতিভাবান আবহাওয়াবিদ কেট কুপার, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডেইজি এডগার-জোন্স। কলেজ জীবনে তিনি একটি ভয়াবহ EF5 টর্নেডোর মুখোমুখি হয়ে গভীর মানসিক আঘাত পান, যেখানে তার বন্ধুদের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনার পর তিনি মাঠ পর্যায়ের গবেষণা ছেড়ে দিয়ে নিরাপদে অফিসে বসে ঝড়ের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্ক সিটিতে একটি অফিসে কাজ করছেন।
পরে তিনি তার বন্ধু জাভির সঙ্গে ওকলাহোমায় একটি নতুন ঝড়-স্ক্যানিং সিস্টেম পরীক্ষা করার জন্য আবার মাঠে ফিরে আসেন।
সেখানে তিনি মুখোমুখি হন টাইলার ওয়েন্সের, একজন ক্যারিশম্যাটিক কিন্তু কিছুটা দুঃসাহসী সোশ্যাল মিডিয়া তারকা, যিনি ভিউ পাওয়ার জন্য টর্নেডো অনুসরণ করেন। শুরুতে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও, ধীরে ধীরে সম্পর্ক বদলাতে থাকে।
একই সময়ে কেট জানতে পারেন যে জাভির কর্পোরেট স্পনসর একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী, যিনি দুর্যোগকে কাজে লাগিয়ে লাভ করছেন। অন্যদিকে টাইলার প্রমাণ করেন যে তিনি একজন প্রশিক্ষিত আবহাওয়াবিদ, যিনি নিজের অনলাইন জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে স্থানীয় ত্রাণ কার্যক্রমে অর্থ সহায়তা করেন।
শেষ পর্যন্ত কেট এবং টাইলার একসঙ্গে কাজ করে কেটের পুরোনো গবেষণার সূত্র ব্যবহার করেন একটি রাসায়নিক ফর্মুলা, যা টর্নেডোকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলতে পারে। চূড়ান্ত দৃশ্যে কেট সরাসরি এক ভয়ংকর টর্নেডোর মধ্যে প্রবেশ করেন এবং সেই মিশ্রণ ব্যবহার করে ঝড়টি দুর্বল করে একটি শহরকে রক্ষা করেন।
চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন অস্কার-মনোনীত নির্মাতা লি আইজ্যাক চাং, যিনি মিনারি-এর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। চিত্রনাট্য লিখেছেন মার্ক এল. স্মিথ, যিনি দ্য রেভেন্যান্ট-এর সহলেখক ছিলেন। গল্পটি নির্মিত হয়েছে জোসেফ কোসিনস্কি-এর ধারণা থেকে; তিনি টপ গান: ম্যাভেরিক পরিচালনা করেছিলেন। এটি ডিজনি প্লাসে দেখা যাবে।
এপিক টেইলস- Epic Tails

২০২৩ সালের এই ফরাসি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে প্যাটি নামের একটি ইঁদুরের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিপ্রাপ্ত সংস্করণে চরিত্রটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন এলি জেইলার। প্যাটি বাস করে প্রাচীন গ্রিসের একটি শহরে, যেখানে তার সবচেয়ে বড় আদর্শ জেসনও (কণ্ঠ দিয়েছেন টেরেন্স স্ক্যামেল)অবাস করেন। তবে এখন জেসন বয়সের ভারে ন্যুব্জ, তার রোমাঞ্চকর অভিযানের দিন অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তবুও প্যাটি তাকে শ্রদ্ধা করে এবং নিজেও একদিন মহান অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
প্যাটির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু লুইজি, আরেকটি ইঁদুর, যার কণ্ঠ দিয়েছেন ওয়াইট বোয়েন। তারও বড় স্বপ্ন আছে। সে যোগ দিতে চায় ‘নিনজা র্যাটস’-নামে নাচতে ও লড়তে পারদর্শী এমন ইঁদুরদের এক হাস্যকর বাহিনীতে।
একদিন শহরে দেবরাজ জিউস এর একটি বিশাল মূর্তি উন্মোচন করা হয়। এতে সমুদ্রদেবতা পসাইডন (এ চরিত্রেও কণ্ঠ দিয়েছেন টেরেন্স স্ক্যামেল) ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি শহরবাসীকে হুমকি দেন যে, আগামী সাত দিনের মধ্যে যদি তার সম্মানে আরও বড় একটি মূর্তি নির্মাণ না করা হয়, তাহলে তিনি একটি “ভয়াবহ বিপর্যয়” ডেকে আনবেন।
এই পরিস্থিতিতে প্যাটি এবং তার বন্ধুরা অবশেষে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পায়। এটাই তাদের জন্য সত্যিকারের অভিযানে নামার মুহূর্ত।
শিশুদের অ্যানিমেশনের সঙ্গে গ্রিক পুরাণকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এটি একটি ব্যতিক্রমী ও মজার প্রচেষ্টা। প্যাটির গল্প ছোটদের শেখায় যে সব নায়কই বিশালাকৃতির বা অসাধারণ শক্তিশালী হয় না। কখনও কখনও একজন নায়ক একটি ছোট্ট ইঁদুরও হতে পারে।
চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন ডেভিড আলাক্স, যিনি জঙ্গল বাঞ্চ-এর জন্য পরিচিত। চিত্রনাট্য লিখেছেন ডেভিড আলক্স, এরিক টোস্টি এবং জাঁ-ফ্রাঁসোয়া টোস্টি। এর আগে তাঁরা ট্রেনে পোষা প্রাণী-এর চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন। এটি দেখা যাবে ওটিটি প্লাটফর্ম হুলুতে (Hulu)।


