Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬

হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি – এক শহরের নিভে যাওয়া আলো

হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি - এক শহরের নিভে যাওয়া আলো
হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি – এক শহরের নিভে যাওয়া আলো

সিনেমা হল সংস্কৃতি – পোস্টার, টিকিট লাইন আর হারানো উন্মাদনা

ঢাকা শহরকে যারা শুধু যানজট, কংক্রিট আর কোলাহলের শহর হিসেবে চেনেন, তারা হয়তো জানেন না, এই শহরের বুকেই একসময় সন্ধ্যার পর আলো জ্বলে উঠত অন্য রকম। সেই আলো আসত সিনেমা হলের ফটক থেকে। বড় বড় হাতে আঁকা পোস্টার, টিকিট কাউন্টারের সামনে মানুষের লাইন, আর ভেতর থেকে ভেসে আসা সংলাপ আর গানের সুর, সব মিলিয়ে সিনেমা হল ছিল ঢাকার এক বিশেষ আবেগ। আজ সেই আলো নিভে গেছে। যে হলগুলো একসময় মানুষের হাসি, কান্না, হাততালির সাক্ষী ছিল, সেগুলোর অনেকগুলো এখন নীরব, পরিত্যক্ত কিংবা পুরোপুরি ভিন্ন কোনো পরিচয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকার হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি তাই শুধু বিনোদনের গল্প নয়, এটা এক শহরের বদলে যাওয়ার দলিল।

সিনেমা হল: নগর জীবনের সামাজিক আয়না

একসময় সিনেমা হলে যাওয়া মানে ছিল নিজেকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করা। পরিবার নিয়ে শুক্রবারের বিকেলের শো, বন্ধুদের সঙ্গে রাতের শেষ শো, কিংবা ঈদের সকালে নতুন সিনেমা দেখতে যাওয়ার উত্তেজনা, এই অভ্যাসগুলো ঢাকার সামাজিক জীবনের অংশ ছিল। সিনেমা হল ছিল এমন এক জায়গা, যেখানে ধনী-গরিব, চাকরিজীবী-ছাত্র সবাই একই পর্দার দিকে তাকিয়ে একসঙ্গে হাসত বা কাঁদত। আজকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিনোদনের যুগে এমন সামষ্টিক অভিজ্ঞতা প্রায় অচেনা।

হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি
হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি

গুলিস্তান: এক সময়ের ‘হলপাড়া’

ঢাকার সিনেমা হল সংস্কৃতির কথা বললে গুলিস্তানকে বাদ দেওয়া যায় না। আজাদ, পূর্ণিমা, মধুমিতা, বলাকা, রাজমণি, এই নামগুলো শুধু হল নয়, একেকটা সময়ের প্রতীক। মধুমিতা ছিল প্রিমিয়ারের হল। নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই সেখানে উপচে পড়া ভিড়। টিকিট না পেলে অনেকেই ফিরে যেতেন, আবার কেউ কেউ কালোবাজারে বাড়তি দামে টিকিট কিনতেন। রাজমণি বা আজাদের মতো হলগুলো ছিল সাধারণ দর্শকের জায়গা, যেখানে শিস, করতালি আর সংলাপের সঙ্গে দর্শকের কথাবার্তা মিলেমিশে যেত।

হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি

মালিবাগ, মগবাজার, নিউ মার্কেটের হলজীবন

শুধু গুলিস্তান নয়, মালিবাগ, মগবাজার, নিউ মার্কেট, আজিমপুর, এই এলাকাগুলোতেও সিনেমা হল ছিল নগর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চিত্রা, লায়ন, শেরাটন, এসব হল মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে তুলনামূলক নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। অনেক পরিবার সপ্তাহের নির্দিষ্ট একদিন ঠিক করত সিনেমা দেখার জন্য। সিনেমা হলে যাওয়া ছিল এক ধরনের রুটিন, এক ধরনের সামাজিক রিচুয়াল।

সিনেমা দেখার প্রস্তুতি: এক হারানো অভ্যাস

সিনেমা হলে যাওয়ার আগে প্রস্তুতিরও একটা আনন্দ ছিল। কে কোন শো দেখবে, কার সঙ্গে যাবে, কোন সারিতে বসবে এসব নিয়ে আগেই আলোচনা হতো। টিকিট কাটার লাইনে দাঁড়িয়ে শুরু হতো সিনেমার গল্প নিয়ে জল্পনা। হলের ভেতরে লাইট নিভে যেতেই যে উচ্ছ্বাস তৈরি হতো, সেটা ছিল সম্মিলিত উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ। আজ মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে সেই উত্তেজনা পাওয়া যায় না।

বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ ও হলের উত্থান

সত্তর ও আশির দশক বাংলা সিনেমার জন্য ছিল স্বর্ণযুগ। রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, ববিতা, আলমগীর, এই নামগুলো সিনেমা হলকে ভরিয়ে দিত। কোনো কোনো সিনেমা মাসের পর মাস চলত হাউসফুল। গান ছিল আলাদা আকর্ষণ। অনেক দর্শক একাধিকবার সিনেমা দেখতেন শুধু গান শোনার জন্য। সিনেমা হল ছিল তারকা তৈরির কারখানা, আর দর্শক ছিল সেই প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশ।

হলের বাইরের জীবন: এক অর্থনৈতিক জগৎ

সিনেমা হল শুধু পর্দার ভেতরের গল্প নয়, বাইরে ছিল আলাদা জীবন। পোস্টার শিল্পীরা রাত জেগে বিশাল ক্যানভাসে নায়কের মুখ আঁকতেন। বাদাম, চানাচুর, চা, ফুচকা বিক্রেতাদের ভিড় জমত শোয়ের ফাঁকে। টিকিট বিক্রেতা থেকে দারোয়ান অনেক মানুষের জীবিকা জড়িয়ে ছিল এই হলগুলোর সঙ্গে। হল বন্ধ মানে শুধু বিনোদন হারানো নয়, বহু মানুষের জীবনের ছন্দ বদলে যাওয়া।

হলের বাইরের জীবন এক অর্থনৈতিক জগৎ
হলের বাইরের জীবন: এক অর্থনৈতিক জগৎ

পতনের শুরু: প্রযুক্তি ও অবহেলা

নব্বইয়ের দশক থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। টেলিভিশনের বিস্তার, ভিসিআর, পরে ডিভিডি ও ইন্টারনেট মানুষ ঘরে বসেই বিনোদন পেতে শুরু করে। একই সঙ্গে বাংলা সিনেমার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গল্পের পুনরাবৃত্তি, দুর্বল নির্মাণ আর অশালীনতার অভিযোগ দর্শককে হলবিমুখ করে তোলে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক হল ধীরে ধীরে জীর্ণ হয়ে পড়ে।

হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি
পতনের শুরু: প্রযুক্তি ও অবহেলা

নিরাপত্তা সংকট ও দর্শক হারানো

পরিবেশ ও নিরাপত্তাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অস্বাস্থ্যকর বসার জায়গা, খারাপ সাউন্ড, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের অভাব এসব কারণে পরিবার নিয়ে হলে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতে থাকে। নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় দর্শকসংখ্যা আরও কমে যায়। সিনেমা হল তখন আর সামাজিক মিলনমেলা থাকে না, হয়ে ওঠে অবহেলার জায়গা।

রূপান্তর – হল থেকে মার্কেট

যে হলগুলো একসময় আলোয় ঝলমল করত, সেগুলোর অনেকগুলো ভেঙে গড়ে ওঠে মার্কেট, গুদাম বা অফিস। কোনো কোনো জায়গায় এখন বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে আছে। নামগুলো রয়ে গেছে শুধু পুরোনো মানুষের স্মৃতিতে। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব জায়গা শুধুই একটা লোকেশন তারা জানেই না এখানে একসময় সিনেমা দেখা হতো।

হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি

মাল্টিপ্লেক্স – নতুন আঙ্গিক, ভিন্ন অভিজ্ঞতা

দুই হাজারের দশকে ঢাকায় মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি আসে। আধুনিক প্রযুক্তি, আরামদায়ক আসন আর পরিষ্কার পরিবেশ থাকলেও পুরোনো হলের সেই গণমানুষের আবেগ এখানে অনুপস্থিত। মাল্টিপ্লেক্স হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট শ্রেণির বিনোদনকেন্দ্র। সিনেমা দেখা এখন আর সামাজিক ঘটনা নয়, বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

মাল্টিপ্লেক্স
মাল্টিপ্লেক্স – নতুন আঙ্গিক, ভিন্ন অভিজ্ঞতা

স্মৃতিতে বেঁচে থাকা হল সংস্কৃতি

অনেক ঢাকাবাসীর স্মৃতির আলমারিতে একটা বিশেষ তাক আছে সেখানে টিকিটের ছোট্ট কাগজ, কোনো পুরোনো সিনেমার গান, বা সিনেমা হলের সামনের পোস্টারের রঙ লেগে আছে। কারও মনে আছে, বাবা হাতে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রথমবার; কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখে মনে হয়েছিল, শহরের সবাই বুঝি আজ একই সিনেমা দেখতে এসেছে। লাইট নিভতেই ভেতরটা হঠাৎ করে নীরব তারপর প্রথম সংলাপের সঙ্গে সঙ্গে একযোগে হাততালি। ওই মুহূর্তটা শুধু সিনেমা দেখা নয়, যেন শহরের সঙ্গে পরিচয় হওয়া।

হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি

আবার কারও স্মৃতি জড়িয়ে আছে বিরতির ঘণ্টায়। পর্দায় ‘ইন্টারভ্যাল’ লেখা উঠলেই এক অদ্ভুত তাড়া , কে আগে বের হবে, কে আগে ফিরবে। বাইরে তখন ফুচকা-চটপটি, বাদাম-চানাচুর, কাগজে মোড়ানো চা, সব মিলিয়ে একটা ক্ষণিকের মেলা। কেউ কেউ অন্ধকার করিডরে দাঁড়িয়ে সিনেমার গল্প নিয়ে তর্ক করত, কেউ হাসত প্রিয় নায়কের সংলাপ নকল করে। শো শেষ হলে বাইরে বেরিয়ে আসার পরও সিনেমাটা মাথার ভেতর চলতে থাকত, রিকশায় ফেরার পথে শহরের আলো-ছায়ার সঙ্গে মিশে যেত পর্দার দৃশ্য।

শীতের সন্ধ্যায় গুলিস্তান

গুলিস্তানের হলপাড়ার একটা ব্যক্তিগত দৃশ্য বারবার ফিরে আসে, শীতের সন্ধ্যায় গুলিস্তান মোড়ের বাতাসে ধোঁয়া আর ভাজাপোড়ার গন্ধ মিশে আছে, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পোস্টারের রং আরও উজ্জ্বল দেখায়। কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা বারবার ঘড়ি দেখে, যেন শো মিস না হয়। টিকিট হাতে পেয়েই সে বুকপকেটে ভাঁজ করে রাখে যেন হারিয়ে না যায় কোনো মূল্যবান জিনিস। ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ান একবার চোখ বুলিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেয়। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হয়, শহরের কোলাহলটা বাইরে পড়ে রইল; ভেতরে ঢুকলেই শুরু হবে অন্য একটা সময় যেখানে দু’ঘণ্টার জন্য আমরা সবাই একই গল্পের নাগরিক।

আরেকটা স্মৃতি, শেষ শো শেষ করে ফিরতি পথ। তখন রাত বেশ হয়েছে, বাস কম, রিকশাও মিলতে চায় না। সিনেমা থেকে বেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, গুলিস্তানও যেন ধীরে ধীরে ঘুমোচ্ছে। কোনো এক চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ‘শেষ দৃশ্যে কী বলা হলো’ তা নিয়ে তর্ক জমে ওঠে। কারও চোখে তখনো পর্দার নায়কের ঝলক, কারও কানে বাজে শেষ গানের সুর। এই ‘ফিরতি পথ’টাই ছিল সিনেমা হল সংস্কৃতির অদৃশ্য অংশ, সিনেমা শেষ, কিন্তু গল্পটা শেষ নয়; সেটা নিয়ে আলোচনা, হাসাহাসি, তর্ক সব মিলিয়ে শহরের রাতটাকে একটু বেশি জীবন্ত করে তুলত। তবু সিনেমা হল পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। স্মৃতিতে তারা এখনো জীবিত। অনেকের প্রথম প্রেমের গল্প জড়িয়ে আছে কোনো হলের শেষ সারির সিটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো পোস্টার বা হলের ছবি দেখলে বোঝা যায়, এই সংস্কৃতি মানুষের মনে এখনো জায়গা করে আছে।

ভবিষ্যৎ – ফিরে আসার সম্ভাবনা কি আছে?

সবকিছুর পরও আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা যদি ভালো গল্প বলেন, আর যদি হলগুলোর পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হয়তো আবার দর্শক ফিরবে। রূপ বদলাতে পারে, কিন্তু সিনেমা হলের আত্মা পুরোপুরি মরে যায়নি।

ঢাকার হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হল সংস্কৃতি আসলে এক শহরের পরিবর্তনের গল্প। এটা আমাদের সামাজিক অভ্যাস, বিনোদনের ধরন আর জীবনযাপনের বদলে যাওয়ার ইতিহাস। আজ হলের আলো নিভে গেলেও স্মৃতির পর্দায় সেই আলো এখনো জ্বলছে। হয়তো কোনো একদিন, নতুন কোনো সন্ধ্যায়, ঢাকার কোনো প্রান্তে আবারও সিনেমা হলের সামনে মানুষের লাইন দেখা যাবে, এই আশা নিয়েই এই গল্প শেষ হয়।

+ posts
Share this article
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Read next

মৌসুমীর সঙ্গে বিচ্ছেদের গুঞ্জনে ক্ষুব্ধ ওমর সানি

বিচ্ছেদের গুঞ্জনের জবাবে যা বললেন ওমর সানি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশে আলাদা থাকছেন চিত্রনায়ক ওমর সানী ও অভিনেত্রী…
মৌসুমীর সঙ্গে বিচ্ছেদের গুঞ্জনে ক্ষুব্ধ ওমর সানি

“দ্য বিটলস-এ ফোর ফিল্ম সিনেমাটিক ইভেন্ট” ছবির প্রথম লুক প্রকাশ

দ্য বিটলস “দ্য বিটলস-এ ফোর ফিল্ম সিনেমাটিক ইভেন্ট” সিনেমার প্রথম লুক প্রকাশ করেছে প্রযোজক সংস্থা। বহুল…
দ্য বিটলস-এ ফোর ফিল্ম

কলকাতার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতলেন জয়া আহসান

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল’ হয়ে পুরস্কার জিতলেন জয়া কলকাতার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতলেন জয়া আহসান।…
কলকাতার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতলেন জয়া আহসান

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছেন নিশো ও পুতুল

সেরা সিনেমা ‘সাঁতাও’, সেরা নির্মাতা সুমন ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।  সেরা…
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছেন নিশো ও পুতুল
0
Share