রক অ্যান্ড রোলের অন্যতম পথিকৃৎ চাক বেরির জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হলো আজ, ১৮ অক্টোবর। ‘জনি বি. গুড’ ও ‘মেবেলিন’-এর মতো গানের মধ্য দিয়ে তিনি বদলে দিয়েছিলেন রকসংগীতের ভাষা। তাঁর গিটার বাজানোর স্বতন্ত্র ধরন ও গীতিরীতি প্রভাবিত করেছে পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য শিল্পীকে।
স্কুলের মঞ্চ থেকে সংগীতের জগতে
১৯২৬ সালের ১৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে জন্ম চার্লস এডওয়ার্ড অ্যান্ডারসন বেরির, যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত চাক বেরি নামে। সংগীত জীবনের শুরুতে ন্যাট ‘কিং’ কোলের কণ্ঠ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। পাশাপাশি মাডি ওয়াটার্সের মতো ব্লুজশিল্পীদের গানও তাঁর সংগীতচিন্তায় প্রভাব ফেলে।
১৯৪১ সালে স্কুলের এক অনুষ্ঠানে জে ম্যাকশ্যানের ‘কনফেসিন’ দ্য ব্লুজ’ গানটি পরিবেশন করেন বেরি। সে সময় স্কুলের অনুষ্ঠানে ব্লুজ গাওয়া খুব একটা প্রচলিত ছিল না। তবে তাঁর পরিবেশনা দর্শকদের কাছ থেকে দারুণ সাড়া পায়। এই অভিজ্ঞতা মঞ্চে সংগীত পরিবেশনের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

বেরির সংগীত জীবনে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৫৫ সালে। ব্লুজশিল্পী মাডি ওয়াটার্সের পরামর্শে শিকাগোর চেস রেকর্ডসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর গান ‘মেবেলিন’। গানটি পপ সংগীতের তালিকায় সাফল্য পায় এবং রিদম অ্যান্ড ব্লুজের শ্রোতাদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সংগীতে নিজের জায়গা তৈরি করেন বেরি।
চাক বেরির কালজয়ী গান ‘জনি বি. গুড’
চাক বেরির নাম উঠলে প্রথমেই মনে পড়ে ‘জনি বি. গুড’-এর কথা। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত গানটি এক তরুণের গিটারবাদক হয়ে ওঠার স্বপ্নকে কেন্দ্র করে তৈরি। প্রাণবন্ত গিটার রিফ, দ্রুত ছন্দ ও সহজে মনে থাকার মতো সুর গানটিকে রকসংগীতের অন্যতম কালজয়ী রচনায় পরিণত করেছে। ১৯৭৭ সালে নাসার ভয়েজার মহাকাশযানে পাঠানো সোনালি রেকর্ডে গানটির রেকর্ডিংও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই রেকর্ডে পৃথিবীর সংগীত ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরা হয়েছিল।
রোল ওভার, বিটোফেন’ ‘সুইট লিটল সিক্সটিন’, ‘স্কুল ডেজ’ ও ‘মেমফিস’-এর মতো গানেও বেরি তুলে ধরেছেন তরুণদের জীবন, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। তাঁর গানে গিটার কেবল কণ্ঠের সঙ্গী ছিল না; স্বতন্ত্র সুর ও ছন্দের মাধ্যমে সেটিই হয়ে উঠেছিল সংগীতের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
বেরির প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। বিটলস ও রোলিং স্টোনসের মতো ব্যান্ড তাঁর গান থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে এবং তাঁর রচনা পরিবেশন করেছে। রোলিং স্টোনসের গিটারবাদক কিথ রিচার্ডসও বেরির গিটার বাজানোর ধরনকে নিজের সংগীত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হিসেবে স্বীকার করেছেন। জন লেননের সঙ্গে বহুল প্রচলিত একটি মন্তব্যও জড়িয়ে আছে রক অ্যান্ড রোলকে অন্য কোনো নামে ডাকতে হলে সেটি হতে পারে ‘চাক বেরি’।
সংগীতের সুরে বর্ণবৈষম্যের দেয়াল পেরিয়ে
চাক বেরির সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর সংগীতের সামাজিক প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্য যখন সমাজের নানা ক্ষেত্রে গভীরভাবে বিদ্যমান, তখন একজন কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে তিনি বিপুলসংখ্যক শ্বেতাঙ্গ তরুণ শ্রোতার কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ব্লুজ, কান্ট্রি ও রিদম অ্যান্ড ব্লুজের উপাদান মিলিয়ে গড়ে তোলা তাঁর সংগীতধারা বিভিন্ন বর্ণের শ্রোতাদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করেছিল।

মঞ্চে বেরির উপস্থিতিও ছিল ব্যতিক্রমী। গিটার বাজানোর সময় হাঁটু ভাঁজ করে এগিয়ে যাওয়ার তাঁর বিশেষ ভঙ্গি ‘ডাক ওয়াক’ নামে পরিচিতি পায়। গানের পাশাপাশি এই পরিবেশনা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
সংগীতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে নানা পর্যায়ে। ১৯৮৪ সালে তিনি গ্র্যামি আজীবন সম্মাননা পান। ১৯৮৬ সালে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমের প্রথম অন্তর্ভুক্ত শিল্পীদের দলে জায়গা করে নেন তিনি।
শেষ অধ্যায়, অমলিন উত্তরাধিকার
দীর্ঘ সংগীতজীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছেন চাক বেরি। ১৯৭২ সালে ‘মাই ডিং-আ-লিং’ যুক্তরাষ্ট্রের পপ চার্টে শীর্ষস্থান অর্জন করে। এটিই ছিল তাঁর একমাত্র গান, যা ওই চার্টের এক নম্বরে পৌঁছেছিল। ২০১৭ সালের ১৮ মার্চ, ৯০ বছর বয়সে মারা যান বেরি। একই বছরের জুনে প্রকাশিত হয় তাঁর শেষ স্টুডিও অ্যালবাম ‘চাক’।
জন্মের এক শতাব্দী পরও চাক বেরির গুরুত্ব শুধু তাঁর জনপ্রিয় গান গুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গিটারকে রকসংগীতের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করা, তরুণদের অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষাকে গানে তুলে ধরা এবং মঞ্চে পরিবেশনার ধরন বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাঁকে সংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে। নতুন প্রজন্মের গিটারবাদকেরা যখন ‘জনি বি. গুড’-এর পরিচিত সুর বাজান, তখনও ফিরে আসে সেই শিল্পীর উত্তরাধিকার, যিনি রক অ্যান্ড রোলকে দিয়েছিলেন স্বতন্ত্র ভাষা ও পরিচয়।
তথ্যসূত্র: চাক বেরির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট, রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম ও গ্র্যামির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট।









