সাতটি শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী যুগল
প্রতিদ্বন্দ্বিতারও এক ধরনের শিল্প আছে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শিল্পের নিয়ম ও ধারাবাহিকতা প্রাচীনকাল থেকে শুরু হয়ে হাজার হাজার বছর ধরে সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে রূপদান করেছে। কে জানে! হাজার হাজার বছর আগে যখন প্রাচীন গুহায় প্রথম প্রথম চিত্র আঁকা হত তখনো হয়তো দুই শিল্পীর মধ্যে হয়েছিলো প্রতিযোগিতা। হয়তো সমুদ্রের পাড়ে একটি সফল শিকারের পর এক পাশে আগুন জ্বালিয়ে সমুদ্রের বালিতেও এঁকেছিল তারা চিত্র আর কিছুক্ষণ পরেই পানি এসে ধুয়ে দিত সেসব। এসবই কল্পনা, কারণ গ্রন্থিত নেই সেসব। তবে লিপিবদ্ধ ইতিহাসের শুরু থেকে আজ অবধি অনেক চিত্রশিল্পীর কথাও আমরা এখন জানি। জানি সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথাও। এই লিখা তেমনই এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প নিয়ে। চলুন জানি ইতিহাসের সাতটি শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী যুগলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প। বিবিসি অবলম্বনে।
জিউক্সিস ও পারহাসিয়ুস

প্লিনির ন্যাচারাল হিস্ট্রি অনুযায়ী, চিত্রশিল্পী জিউক্সিস প্রাচীন গ্রীসে খ্যাতি অর্জন করেন ৯৫তম অলিম্পিয়াডের চতুর্থ বর্ষে, অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৭ সালে—প্রায় কয়েক দশক পর, যখন ‘অ্যাপলোডোরাস শিল্পের দরজা উন্মুক্ত করেছিলেন।’ একদিন তিনি তাঁর সহকর্মী পারহাসিয়াসকে একটি বাজির মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেন। উভয় শিল্পীই প্রকৃতি অনুকরণের ক্ষেত্রে বেশ দক্ষ ছিলেন, কিন্তু এখন শ্রেষ্ঠশিল্পী কে তা খুঁজে বের করার পালা।
শিল্পীরা থিয়েটারের সামনে তাদের কাজ সাজাতে লাগলেন, এবং জিউক্সিস প্রথমে প্রদর্শন করতে আগ্রহী হলেন। তিনি একটি আঙুরের ছবি দেখালেন, যা এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে পাখিরা উড়ে এসে আঙুরে ঠোকরাতে শুরু করে।
এরপর পারহাসিয়াসের পালা। পারহাসিয়াস পর্দায় ঢাকা একটি ছবি উপস্থাপন করেন। নিজ বিজয় নিশ্চিত মনে করে জিউক্সিস পারহাসিয়াসকে অনুরোধ করলেন পর্দাটি সরিয়ে ছবিটি দেখানোর জন্য। চমক সৃষ্টি হয় তখন যখন দেখা গেল, ছবিটি প্রকৃতপক্ষে শুধুই সেই পর্দার যথার্থ প্রতিরূপ ছিলো। পর্দাটা ছিলো এক অসামান্য বিভ্রম। জিউক্সিস পরাজয় স্বীকার করলেন। এর থেকে শিক্ষা কী? জিততে চাইলে প্রতারককেই প্রতারিত করতে হয়।
জীবনের পরে তিনি আরেকবার চেষ্টা করলেন। তিনি একটি শিশুকে আঙুরের পাত্র হাতে ধরে আঁকলেন। আবারও পাখিরা উড়ে এসে খাবারের জন্য ভিড় করল। জিউক্সিস রেগে গিয়েছিলেন। তিনি চিৎকার করে বললেন, যদি তিনি শিশুটিকে একই দক্ষতায় চিত্রিত করতেন, তবে পাখিরা ছবির কাছে আসার সাহসও পেত না।
আর পারহাসিয়াস? কিংবদন্তি বলে যে প্রকৃতি তার প্রতি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। তিনবার বজ্রপাত আঘাত হানল তার মেলিয়াগার, হেরাকলেস এবং পারসিয়াস চিত্রে, তবু ছবিটি অক্ষত রইল।
জে. এম. ডব্লিউ. টার্নার ও জন কনস্টেবল

দুই সহস্রাব্দেরও বেশি সময় পরে, ১৮৩২ সালে, ব্রিটিশ রোমান্টিক চিত্রশিল্পী জে. এম. ডব্লিউ. টার্নার নিজেকে খুঁজে পান একই রকম এক তীব্র দ্বন্দ্বে আবদ্ধ অবস্থায় তাঁরই সমসাময়িক শিল্পী জন কনস্টেবলের সঙ্গে। লন্ডনের রয়্যাল একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে দুজনের ছবি পাশাপাশি ঝোলানো হলে এই প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কনস্টেবলের বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ চিত্রকর্ম দ্য ওপেনিং অব ওয়াটারলু ব্রিজ (ওয়াটারলু ব্রিজ, ফ্রম হোয়াইটহল স্টেয়ার্স,১৮ জুন ১৮১৭) তে দেখা যায় প্রিন্স রিজেন্টের শোভাযাত্রা রাজকীয় নৌকার দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য অপূর্ব নিখুঁততায়একেছেন। কিন্তু বিপরীতে টার্নারের চিত্রকর্ম হল তুলনামূলকভাবে ছোট একটি সমুদ্রদৃশ্য। সেই ছবিতে টার্নার এঁকেছিলেন ডাচ বন্দর শহর হেলভুটস্লুইসের দৃশ্য।
কনস্টেবল তার জটিল ও বিস্তৃত ক্যানভাসটি তৈরিতে এক দশকেরও বেশি সময় ব্যয় করেছিলেন। তুলনায়, আকারে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছোট টার্নারের ছবিটি যেন কনস্টেবলের কাজের পাশে একটি অসম্পূর্ণ খসড়ার মতো মনে হচ্ছিল।

নিজের কাজটি কনস্টেবলের পরিশীলিত চিত্রকর্মের পাশে নিষ্প্রভ ও তড়িঘড়ি করে করা বলে মনে হতে থাকে। এমন আশঙ্কায় টার্নার হঠাৎ তুলি হাতে নিয়ে ছবির সামনের ঢেউয়ের চূড়ায় উজ্জ্বল লাল রঙের একটি মাত্র আঁচড় বসান। সেই তীব্র লাল রঙের দাগটি—পরে যা একটি ভাসমান বয়া হিসেবে রূপ পায়—অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দৃশ্যটিতে এক অদ্ভুত মোহ, রহস্য ও নাটকীয়তা যোগ করে। কবজির এই এক ঝটকাতেই টার্নার এই চিত্রকর্মের প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে দেন।
টার্নারের এই তীব্র ও আকস্মিক কৌশল চোখে পড়তেই কনস্টেবল নাকি বিস্ময়ে বলে ওঠেন, “ও এখানে এসে বন্দুক ছুড়েছে।”
তো এর থেকে শিক্ষা কী? গুলির লড়াইয়ে যার হাত দ্রুত চলে, জয় তারই।
কোথায় টার্নারের সেই চিত্রকর্মটি?
এই দুই ব্রিটিশ রোমান্টিক চিত্রশিল্পীর মধ্যকার সেই প্রাণবন্ত ও সৃজনশীল উত্তেজনাই এখন টেট ব্রিটেনে আয়োজিত এক বৃহৎ প্রদর্শনীর কেন্দ্রবিন্দুতে যার নাম টার্নার অ্যান্ড কনস্টেবল: রাইভালস অ্যান্ড অরিজিনালস। ১৭০টিরও বেশি চিত্রকর্ম ও কাগজে অঙ্কিত কাজ নিয়ে সাজানো এই প্রদর্শনীতে এমন সব ক্যানভাসও রয়েছে, যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ব্রিটেনে দেখা যায়নি। প্রদর্শনীটি অনুসন্ধান করে দেখায়, প্রতিযোগিতার চাপপূর্ণ পরিবেশ কীভাবে তাঁদের শিল্প, কল্পনা ও উত্তরাধিকারকে গভীরভাবে রূপ দিয়েছে।
তবে বর্তমানে টার্নারের হেলভুটস্লুইসের সেই দৃশ্যচিত্রটি প্রদর্শনীর জন্য আনা সম্ভব হয়নি কারণ এটি জাপানের টোকিও ফুজি আর্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত করা আছে। ফলে দ্য ওপেনিং অব ওয়াটারলু ব্রিজ–এর সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক মুখোমুখি অবস্থান পুনর্নির্মাণ করা যায়নি—তবু প্রদর্শনীর আয়োজকেরা তার বদলে দুটি এমন কাজ বেছে নিয়েছেন, যেগুলো কনস্টেবল নিজেই ১৮৩১ সালে রয়্যাল একাডেমির হ্যাংগিং কমিটির সদস্য হিসেবে পাশাপাশি ঝুলিয়েছিলেন।
এই সুচিন্তিত দ্বন্দ্বটি ছিল টার্নারের ক্যালিগুলার প্যালেস অ্যান্ড ব্রিজ এবং কনস্টেবলের নিজস্ব স্যালিসবারি ক্যাথেড্রাল ফ্রম দ্য মেডোজ–এর মধ্যে। শিল্পীদের বহু দশকব্যাপী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসে এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই মুখোমুখি অবস্থান এক সমালোচককে দুজনের মৌলিক পার্থক্য নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছিল। সেই সমালোচক টার্নারের চিত্রকর্মকে আগুন আর কনস্টেবলের চিত্রকর্মকে বৃষ্টি বলে অভিহিত করেছিলেন।”
আগুন আর জল
মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জন্ম নেওয়া (টার্নার ১৭৭৫ সালে ধোঁয়ায় মোড়া লন্ডনে, আর কনস্টেবল ১৭৭৬ সালে শান্ত সাফোকের এক গ্রামে), এই দুই শিল্পী শুরু থেকেই ছিলেন পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত। ১৮৩১ সালে এক সমালোচকের ভাষায়, “আগুন আর জল”। নাপিতের ছেলে টার্নার মাত্র ১৪ বছর বয়সেই শিল্পশিক্ষা শুরু করেন। বিপরীতে, সচ্ছল শস্যব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান কনস্টেবল বিশের কোঠায় পৌঁছানোর পর চিত্রকলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। জীবন সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যক্তিত্ব ছিল গভীরভাবে ভিন্ন। এই ভিন্নতা শুধু তাঁদের নিজ নিজ শৈলীতেই প্রতিফলিত হয়নি, বরং সমালোচকদের জন্য এক স্থায়ী আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে। তাই চিত্রকলা সমালোচকগণ তাঁরা কখনোই এই দুজনকে তুলনা করে দেখা থেকে বিরত থাকেননি।
১৮২৯ সালে লন্ডন ম্যাগাজিন-এ প্রকাশিত এক বেনামি সমালোচকের মতে, কনস্টেবল ছিলেন “পুরোটাই সত্য”, আর টার্নার ছিলেন “পুরোটাই কবিতা”। তিনি উপসংহারে লিখেছিলেন, “একজন রূপা, অন্যজন সোনা।”
অবশ্যই কোনো প্রতিযোগীই রূপা জিতে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না। কিন্তু শীর্ষে পৌঁছাতে আসলে কী প্রয়োজন? শিল্প–ইতিহাসের কিছু শ্রেষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে ফিরে তাকালে এমনকি ১৬শ শতকের শুরুতে লিওনার্দো ও মাইকেলেঞ্জেলোর মধ্যকার মহাকাব্যিক দ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে ১৯শ শতকের শেষভাগে ভ্যান গঘ ও গগ্যাঁর বিখ্যাত সংঘর্ষ পর্যন্ত—প্রতিভাবান প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হলে কীভাবে নিজেকে সামলাতে হয়, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
দা ভিঞ্চি বনাম মাইকেলেঞ্জেলো

ইতালীয় লেখক জর্জিও ভাসারির বর্ণনা অনুযায়ী, এই দুই শিল্পী–প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ কটুক্তির একটি ঘটনা ঘটে প্রায় ১৫০৩ সালে ফ্লোরেন্সের রাস্তায়। সেদিন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি একদল লোককে দান্তের কিছু দুর্বোধ্য পঙ্ক্তি নিয়ে আলোচনা করতে শুনতে পান। খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ও বহুবিদ্যাবিশারদ লিওনার্দোর উপস্থিতি টের পেয়ে তারা তাঁকে অনুরোধ করেন এই কঠিন অংশটির ব্যাখ্যা দিতে। ঠিক সেই সময়ই মাইকেলেঞ্জেলো পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে লিওনার্দো দলটির দিকে ঘুরে বলে ওঠেন, “উনি আপনাদের ব্যাখ্যা করে দেবেন।”
এই মন্তব্যে নিজেকে বিদ্রূপের শিকার মনে করে মাইকেলেঞ্জেলো পাল্টা আক্রমণ করেন। তিনি লিওনার্দোর সেই কুখ্যাত ব্যর্থতার কথা টেনে আনেন মানে বছর কয়েক আগে ভিঞ্চির একটি ব্রোঞ্জের ঘোড়ার ভাস্কর্য অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়ার ঘটনা। মাইকেলেঞ্জেলো তির্যক ভঙ্গিতে লিওনার্দোকে বলেন, “নিজেই ব্যাখ্যা করো, তুমি সেই ঘোড়া-আঁকিয়েই তো, যে লজ্জাজনকভাবে নিজের কাজ ফেলে পালায়!”
নিয়তির পরিহাসে, অল্প সময়ের মধ্যেই এই দুই বৈরী শিল্পীকে ফ্লোরেন্সের পালাজ্জো ভেক্কিওর একই কক্ষের বিপরীত দুই দেয়ালে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী যুদ্ধদৃশ্য অঙ্কনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই মুখোমুখি লড়াই চিরকালই অসমাপ্ত থেকে যায়, কারণ কোনো চিত্রটিই শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করা হয়নি। তবে লিওনার্দোর ব্যাটল অব আঙ্গিয়ারি এবং মাইকেলেঞ্জেলোর ব্যাটল অব ক্যাসিনা–এর খণ্ডিত চিত্রগুলোর অনুলিপি আজও টিকে আছে। সেগুলো থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, দুজনের এই বিরোধই তাঁদের শরীরী শক্তি ও মানসিক সৃজনশীলতাকে আরও তীক্ষ্ণ ও উজ্জীবিত করে তুলেছিলো।
তিতিয়ান বনাম টিন্টোরেত্তো

কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে ওঠে। তিতিয়ান ও টিন্টোরেত্তোর দ্বন্দ্ব তারই উদাহরণ। টিন্টোরেত্তো তখন সম্ভবত কিশোর বয়সেই ছিলেন, যখন ভেনিসীয় শিল্পকলার তৎকালীন সম্রাট ও প্রধান শিকপী, ‘সুরেলা (Sonorous) রঙের গুরু’ তিতিয়ান ঈর্ষান্বিত হয়ে তারই এক প্রতিভাবান ছাত্রকে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই নিজের কর্মশালা থেকে বের করে দেন। এই অবমাননা টিন্টোরেত্তো ভুলে যাননি। তবু তা তাঁকে তিতিয়ানের শিল্পীজীবন গভীরভাবে অনুসরণ করা থেকে কিংবা সম্ভাব্য গুরুর প্রতিটি তুলির আঁচড় অধ্যয়ন করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
বিশেষ করে তিনি প্রায়ই গাল্লেরিয়ে দেল্ল আকাদেমিয়ায় গিয়ে তিতিয়ানের প্রেজেন্টেশন অব দ্য ভার্জিন ইন দ্য টেম্পল (আনুমানিক ১৫৩৪–৩৮) চিত্রকর্মটি দেখতেন এবং নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।
ভেনিসবাসীকে ভিন্ন এক পথ দেখানোর অঙ্গীকার নিয়ে টিন্টোরেত্তো অবশেষে (তিতিয়ান একই বিষয় নিয়ে কাজ করার প্রায় ২০ বছর পর) নিজের প্রেজেন্টেশন অব দ্য ভার্জিন সৃষ্টি করেন। যেখানে তিতিয়ানের চিত্রায়নটি পাথুরে সিঁড়ির ধাপে ধাপে, বাম দিক থেকে ডান দিকে এগোনো এক সুচিন্তিত ও পরিমিত বিন্যাসে গড়ে ওঠে, সেখানে টিন্টোরেত্তোর দৃষ্টিভঙ্গি প্রাণবন্ত ও ঊর্ধ্বমুখী; ঝলমলে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে আমাদের দৃষ্টিকে টেনে নেয় আরও উপরে।
যেন সাবেক শিষ্য তাঁর গুরুকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। একজনের কাজ ছিলো নিখুঁতভাবে পদ্ধতিগত, আর অন্যজনের কাজ যেন অলৌকিকতার প্রতিচ্ছবি।
এলিজাবেথ ভিজে ল্য ব্রুন বনাম অ্যাডেলাইদ লাবিয়ি-গিয়ার

কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতা আদতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয় বরং সেগুলো বিদ্বেষপূর্ণ কল্পনার ফসল। আঠারো শতকের শেষভাগের প্যারিসে এমনটাই ঘটেছিল দুই নারী শিল্পীর সাথে। এলিজাবেথ ভিজে ল্য ব্রুন (মারি অঁতোয়ানেতের প্রিয় প্রতিকৃতি-চিত্রশিল্পী) এবং অ্যাডেলাইদ লাবিয়ি-গিয়ার (নারী চিত্রশিল্পীদের পক্ষে সোচ্চার এক কণ্ঠ) দুজনই অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক একাডেমীতে নারী শিল্পীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ করা চারটি আসনের মধ্যে দুটিতে স্থান পায়।
তাদের এই সাফল্যই তাদের প্রতি মানুষের কুৎসিত গুজবের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। রটানো হয়, তাঁদের প্রকৃত কৃতিত্ব নাকি প্রতিভায় নয়, বরং প্রভাবশালী কমিশন পেতে শয্যাসঙ্গী হওয়া কিংবা পুরুষ শিল্পীদের দিয়ে নিজেদের কাজ আঁকিয়ে নেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে এই দুই শিল্পী বরং সেই যুগের নারীদের খাটো করে দেখার প্রবণতাকেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দুজনেই আঁকেন দুটি অনন্য আত্মপ্রতিকৃতি। ল্য ব্রুনের ‘সেল্ফ–পোর্ট্রেট ইন আ স্ট্র হ্যাট (১৭৮২) এবং লাবিয়ি-গিয়ারের ‘সেল্ফ–পোর্ট্রেট উইথ টু পিউপিলস’ (১৭৮৫)। প্রথম নজরে তাঁদের ভিন্ন স্বভাব ও সুরের কারণে নীরব এক প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু আরও গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, ল্য ব্রুন ও লাবিয়ি-গিয়ারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আশ্চর্যজনকভাবে একই সুরে বাঁধা। সেখানে রয়েছে অবিচল দৃঢ়তা। তাঁদের সংগ্রাম একে অন্যের বিরুদ্ধে ছিল না বরং ছিল তাঁদের সময়ের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিবাদ।
ওরাজিও জেনতিলেস্কি বনাম আর্তেমিসিয়া জেনতিলেস্কি

শব্দতাত্ত্বিকভাবে ‘রাইভ্যালরি’ শব্দটির উৎস লাতিন রিভুস অর্থাৎ ‘ছোট নদী’ থেকে। মানে একই স্রোত ভাগ করে নেয়ার মধ্য দিয়ে আলাদা হয়। আমাদের পরবর্তী জুটি, ওরাজিও জেনতিলেস্কি ও তাঁর কন্যা আর্তেমিসিয়া, তারই নাম। শুরুতে একই পারিবারিক উৎস থেকে প্রবাহিত হলেও পথে ভয়াবহভাবে তাঁদের গন্তব্য ভিন্ন হয়ে যায়। রোমে বাবার স্টুডিওতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আর্তেমিসিয়া ১৬১২ সালে সাক্ষ্য দেন যে তাঁর বাবার সহকর্মী আগোস্তিনো তাস্সি তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন। এই ঘটনার পর বাবা-মেয়ের মধ্যে গভীর আবেগগত ও শিল্পগত এক পরিবর্তন ঘটে।
এই ঘটনার পরেই ওরাজিওর ‘লুট প্লেয়ার’ (১৬১০), এবং আর্তেমিসিয়ার ‘জুডিথ স্লেয়িং হলোফারনেস ‘ (১৬১২), আঁকা হয়। ধারণা করা হয় এর মধ্য দিয়েই দুজনের এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠে। যদিও উভয় ছবিতেই কারাভাজ্জোর কিয়ারোস্কুরোর প্রতি এক যৌথ অনুরাগ লক্ষ করা যায়, তবু আর্তেমিসিয়ার তীব্র, শারীরিক ও নির্দয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এক অবিচল হিংস্রতা রয়েছে, যা নতুন করে মুক্ত হয়ে আসার অনুভূতি দেয়।
ভ্যান গঘ বনাম গগ্যাঁ

শিল্পীসত্তার সংঘর্ষ মেটানোর বা গোপনে দগ্ধ হতে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সামলানোর সবচেয়ে খারাপ উপায় সম্ভবত সেটির অস্তিত্বই অস্বীকার করা। শিল্প যেকোন ভ্রান্তির শত্রু। ১৮৮৮ সালে, ভ্যান গঘ ও গগ্যাঁ আরলের বিখ্যাত ইয়েলো হাউসে একটি যৌথ স্টুডিও গড়ে তোলার প্রয়াস নেন। কিন্তু নিজেদের স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তার দ্বন্দ্বে একসঙ্গে থাকা হয়নি এবং সেই প্রচেষ্টা চরমভাবে ব্যর্থ হয়।
ফলাফল হয়েছিল বিপর্যয়। এবং সহিংসতা। আরো অনেক বিষয় মিলিয়ে ভ্যান গঘ কেটে ফেলেন তাঁর কান। আর গগ্যাঁ প্যারিসে চলে যান। তারা ছিলেন একে অন্যের সমঝদার আবার প্রতিদ্বন্দ্বীও। তাদের একত্রে আঁকা দুটি প্রতিকৃতি—ভ্যান গঘের ম্যান ইন আ রেড বেরেট (১৮৮৮) এবং গগ্যাঁর ‘দ্য পেইন্টার অব সানফ্লাওয়ারস’ তাদের জিজ্ঞাসার দৃষ্টি, বিপরীত কোণ এবং ঠান্ডা যুদ্ধের গল্পই বলে।


