নির্মাতা আমজাদ হোসেনের প্রয়াণ দিবস
আজ ১৪ ডিসেম্বর বাংলা সিনেমার কিংবদন্তী নির্মাতা আমজাদ হোসেন এর প্রয়াণ দিবস । তিনি একাধারে অভিনেতা, লেখক, গীতিকার, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক। তিনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গ্রামবাংলাকে তুলে ধরেছিলেন জাতীয় মঞ্চে। সমাজের নিচু-শ্রেণির মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে এনেছেন পর্দায়, ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজের শ্রেণি বিভাদের কথাও। লিখেছেন অসংখ্য গল্প, উপন্যাস ও জীবনী।
তিনি নয়নমনি, ভাত দে, গোলাপি এখন ট্রেনের মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের স্রষ্টা। অভিনেতা হিসেবেও তিনি ছিলেন বিখ্যাত। পরিচালক হিসেবে ১২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন আমজাদ হোসেন। এছাড়া পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ আরও বেশ কয়েকটি পুরস্কার।

কিংবদন্তী নির্মাতা আমজাদ হোসেনের স্মৃতিচারণ করলেন ববিতা
আমজাদ হোসেনের সাথের স্মৃতি নিয়ে দেশের গণমাধ্যমকে দেয়া এক স্মৃতিকথায় চিত্রনায়িকা ববিতা বলেন, ‘তার পরিচালিত গোলাপী এখন ট্রেনে এবং নয়নমনি সিনেমা ২টি আমাকে দিয়েছিল বেশ দর্শকপ্রিয়তা ও ভালোবাসা। এখনো মানুষের মুখে নয়নমনি, গোলাপি এখন ট্রেনে সিনেমার কথা শুনতে পাই। আমজাদ হোসেন আমার খুব প্রিয় একজন পরিচালক। খুব পছন্দ করতাম তাকে। সম্মানও করতাম। তিনি শুধু দিয়ে গেছেন চলচ্চিত্রে। তার সিনেমার আবেদন কখনো শেষ হবে না। তার সিনেমা মাইলস্টোন হয়ে থাকবে।’
আমজাদ হোসেনকে নিয়ে তার ছেলে সোহেল আরমান স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘বাবাকে সব সময় মনে পড়ে। অনেক কষ্ট হয় বাবাকে ছাড়া। বাবার লেখার টেবিলটার দিকে তাকালে মনে পড়ে বাবার শূণ্যতা। বাবার শূণ্যতা কখনোই পূরণ হবে না।’
তিনি বলেন, ‘বাবা একজন শিক্ষকও ছিলেন আমার কাছে। বাবার কাছ থেকে শিখেছি অনেক কিছু। বাবাকে নিয়ে বলে কখনোই শেষ করা যাবে না। আমি গর্ববোধ করি আমজাদ হোসেনের সন্তান হিসেবে। বাবার জন্য এখনো মন কাঁদে। বাবা যেখানে আছো, ভালো থেকো। তোমার প্রতি ভালোবাসা চিরদিন থাকবে।’
নির্মাতা আমজাদ হোসেনের সিনেমা যাত্রা
১৯৬১ সালে ‘তোমার আমার’ ছবি দিয়ে প্রথম অভিনয়ে আসেন আমজাদ হোসেন। ওই বছরেই মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ ছবিতে অভিনয় করেন। পরিচালক সালাহউদ্দিন তার রচিত নাটক ‘ধারাপাত’ অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ধারাপাত তার রচিত প্রথম চলচ্চিত্র এবং তিনি এই চলচ্চিত্রে একটি প্রধান চরিত্রে অভিনয়ও করেন। পরবর্তীতে জহির রায়হানের সহকারী হিসেবে কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- লোককাহিনিনির্ভর ‘বেহুলা’ (১৯৬৬)।

আমজাদ হোসেন পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুন নিয়ে খেলা’ (১৯৬৭)। তিনি এটি নুরুল হক বাচ্চুর সঙ্গে যৌথভাবে নির্মাণ করেন। একক পরিচালক হিসেবে তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘জুলেখা’ (১৯৬৭)। পরের বছর তিনি নুরুল হক বাচ্চু, মুস্তাফা মেহমুদ ও রহিম নওয়াজের সঙ্গে যৌথভাবে ‘দুই ভাই’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন। ছবিটির প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন জহির রায়হান। এ ছাড়া তিনি এককভাবে ‘বাল্যবন্ধু’ (১৯৬৮) নির্মাণ করেন। ১৯৭০ সালের মুক্তিপ্রাপ্ত জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’র সংলাপ রচনা করেন এবং এতে মধু চরিত্রে অভিনয় করেন। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্বকালীন এ সিনেমা স্বাধীনতা আন্দোলনে গণজোয়ার এনেছিল।
গ্রামবাংলার ভালোবাসার ছবি হিসেবে পরিচিত ‘সুজন সখী’র কাহিনিকার, সংলাপ রচয়িতাও তিনি। এ ছাড়া, ‘আনোয়ারা’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘জয়যাত্রা’, ‘আকাশছোঁয়া ভালোবাসা’র মতো জনপ্রিয় ছবিগুলোর কাহিনিকার তিনি। তিনি নয়ন মণি (১৯৭৬), গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮), সুন্দরী (১৯৭৯), জন্ম থেকে জ্বলছি (১৯৮০), দুই পয়সার আলতা (১৯৮১), কসাই (১৯৮২), ভাত দে (১৯৮৩), সখিনার যুদ্ধ (১৯৮৪), ‘গোলাপী এখন বিলেতে (১৯৮৭), ‘হীরামতি’, ‘প্রাণের মানুষ’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘বাল্যবন্ধু’, ‘পিতাপুত্র’, ‘এই নিয়ে পৃথিবী’, ‘বাংলার মুখ’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। আমজাদ হোসেন এক বছরে রেকর্ড সংখ্যক পাঁচটি পুরস্কার অর্জন করেন। একই সাথে তিনি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা ও গীতিকারের পুরস্কার অর্জন করেন।
লেখক হিসেবে নির্মাতা আমজাদ হোসেন
লেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। বহু উপন্যাস লিখেছেন তিনি। তার রচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’, ‘দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভালোবাসা’, ‘আমি এবং কয়েকটি পোস্টার’, ‘রক্তের ডালপালা’, ‘ফুল বাতাসী’, ‘রাম রহিম’, ‘আগুনে অলঙ্কার’, ‘ঝরা ফুল’, ‘শেষ রজনী, ‘মাধবীর মধাব’, ‘মাধবী ও হিমানী’, ‘মাধবী সংবাদ’,’মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস’, ‘যুদ্ধে যাবো’, ‘অবেলায় অসময়’, ‘উত্তরকাল’, ‘যুদ্ধযাত্রার রাত্রি’।
নানান বিখ্যাত লোকের জীবনীভিত্তিক গ্রন্থও রচনা করেছেন আমজাদ হোসেন। তার মধ্যে অন্যতম, ‘মওলানা ভাসানী জীবন ও রাজনীতি’, ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু জীবন ও রাজনীতি’, ‘মানবেন্দ্রনাথ রায় জীবন ও রাজনীতি’, ‘শ্রী হেমচন্দ্র চক্রবর্তী’ উল্লেখযোগ্য।
শিল্পকলায় অবদান রাখার জন্য ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার-এ ভূষিত করে। ২০০৪ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারও লাভ করেন।
জনপ্রিয় টিভি নাটক জব্বর আলীতে আমজাদ হোসেন
আমজাদ হোসেন জনপ্রিয় টিভি নাটক জব্বর আলীতেও সফল ছিলেন। সত্তর দশক থেকে ঈদ বিনোদনের অন্যতম জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ছিলো ‘জব্বর আলী’। এর নাম ভূমিকায় তিনি অভিনয় করেছেন। নাটকটির গল্প তারই রচিত এবং পরিচালিত।
আমজাদ হোসেন ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে ইশকেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। প্রথমে তাকে ঢাকার ইমপালস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে সরকারী অনুদানে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ২৭শে নভেম্বর ব্যাংককে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৮ সালের ১৪ই ডিসেম্বর ৭৬ বছর বয়সে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে গুণী এই নির্মাতা মৃত্যুবরণ করেন।