Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২০, ২০২৬

আলমগীর কবিরের জীবন-ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাক্ষাৎ থেকে ফেরি দুর্ঘটনা   

আলমগীর কবিরের জীবন
নির্মাতা আলমগীর কবির | ছবি ফেসবুক

আলমগীর কবিরের জীবন

আজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং আধুনিক চলচ্চিত্রের জনক আলমগীর কবিরের  মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৩৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আলমগীর কবির একাধারে সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাতা, চলচ্চিত্র শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, এবং বলা যায় মুক্তিযোদ্ধাও। ছাত্রজীবনে তিনি বামধারার রাজনীতিও করেছেন। সাংবাদিকতা সূত্রে ইন্টার্ভিউ নিয়েছেন ফিদেল ক্যাস্ট্রোর। করেছেন আরো বহুকিছু। চলুন জানি আলমগীর কবিরের জীবন- ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ইন্টারভিউ করা থেকে ফেরিঘাটের দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরো সময়ের পথচলাটুকু।    

আলমগীর কবিরের ডাক নাম ছিল মিন্টু। পিতার চাকরি সূত্রেই তার জন্ম রাঙ্গামাটিতে। এরপর একই কারণে হুগলী কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা শুরু। এরপর দেশভাগের পর ঢাকায় ফিরে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। স্নাতক পাসের ফলাফল বের হবার আগে আগেই ১৯৫৭ সালের শেষদিকে লন্ডন চলে যান।

আলমগীর কবিরের জীবন
আলমগীর কবির | ছবি: ফেসবুক

ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ার সময় সিনেমা দিকপাল ইঙ্গমার বার্গম্যানের সেভেন্থ সিল চলচ্চিত্রটি দেখেন তিনি। এরপর চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগী হয়ে উঠেন। একই সময়ে তিনি বামপন্থী রাজনীতির প্রতিও আকৃষ্ট হন। যোগ দেন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টিতে। ১৯৫৯ সালে লন্ডনে থাকাকালীন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র ডেইলি ওয়ার্কারে রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। জানা যায়, ষাটের দশকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির আনুকূল্যে কিউবায়ও যান।

আলমগীর কবিরের সাথে ফিদেল ক্যাস্ট্রো

কিউবার গেরিলা যোদ্ধা ও প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি। ফিদেল ক্যাস্ট্রো থেকেই গেরিলা যুদ্ধের রণনীতি ও কৌশল সম্পর্কে ধারণা নেন। আলমগীর কবির ৬০ এর দশকে প্যালেস্টাইন ও আলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রামে সরাসরি অংশগ্রহণও করেন। আলজেরিয়া তখন ছিল ফ্রান্সের উপনিবেশ, সেখানকার স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়ানোয় ফরাসী সরকারের বিরাগভাজন হয়ে প্রায় ৮ মাস জেলও খাটেন এই নির্মাতা।

তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও অন্যতম একজন।  ইংল্যান্ডে থাকতেই লন্ডনে উদ্ভব হওয়া ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’ এবং ‘ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট’ সংগঠন দুটির সংগঠক ছিলেন তিনি। সংগঠন দুটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিদেশের মাটিতে ব্যাপক প্রচারণা ও আন্দোলন চালিয়েছে। বর্ণিল জীবন শেষে তিনি ‘৬৬ সালে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে আসার পর বামপন্থী আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে পাকিস্তান সরকার তাকে গ্রেফতার করে। তবে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকায় পাকিস্তান সরকার একপর্যায়ে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় । জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি পুরোপুরিভাবে নিয়োজিত হন সাংবাদিকতায়। প্রথমে ‘পাকিস্তান অবজাভার’-এ, এরপর ‘হলিডে’-তে। 

মুক্তিযুদ্ধে আলমগীর কবিরের অবদান

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় প্রবাসী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। পাশাপাশি সংবাদ পাঠক ও প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘আহমেদ চৌধুরী’ ছদ্মনামে তিনি ইংরেজি খবর ও কথিকা পাঠ করতেন। প্রবাসী সরকারের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবেও তিনি কাজ করেন।  ১৯৩৮সালে রাঙ্গামাটিতে জন্ম নেয়া এই নির্মাতার সিনেমাবন্ধু হয়ে উঠেন।  

আলমগীর কবিরের জীবন
বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার প্রদত্ত আইডি কার্ডে আলমগীর কবির | ছবি: সংগৃহিত

জহির রায়হানের খুবই ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হওয়ায় জহির রায়হানের সাথেই বিভিন্ন রণাঙ্গনে যান তিনি। যুদ্ধ চলাকালীনই জহির রায়হান ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্রটি বানানো শুরু করেছিলেন, যেখানে মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছিল। এই ‘স্টপ জেনোসাইড’ এর সহকারী পরিচালক ছিলেন আলমগীর কবির, এই প্রামাণ্যচিত্রে ধারাভাষ্যের কণ্ঠও তারই দেওয়া।

আলমগীর কবিরের জীবন
স্টপ জেনোসাইড এর একটি বাস্তব দৃশ্য |

এই প্রামাণ্যচিত্র বানাতে গিয়ে একবার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয় দুজনেরই। স্বাধীনতার বেশ পরে একটা টিভি সাক্ষাৎকারে ঘটনাটি বলেছিলেন আলমগীর নিজেই, তিনি বলেন,

“স্টপ জেনোসাইড তৈরি করতে গিয়ে আমরা যখন মালদা বর্ডারে ছিলাম, তখন পাকিস্তানী একটা ক্যাম্প কাছেই ছিল, তারা আমাদের উড়িয়ে দিতে পারত। আমরা দুজনেই একটা মাইনফিল্ডের ভেতর দিয়ে বেকুবের মতো হেঁটে বেরিয়ে গেছি, আমার আগে যারা গেছে তারা মারা গেছে, আমরা বেঁচে আছি। কাজেই আমার আজ এখানে কথা বলার কথা নয়।”   

তিনি নিজেও ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ নামে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

আলমগীর কবিরের মহান জীবনের মুক্তিযুদ্ধোত্তর ধাপ

মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে তিনি বেশ কটি শিল্পমানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘ধীরে বহে মেঘনা’। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত ছবিটি ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির পুরস্কার লাভ করে। এই সিনেমায় বাংলাদেশের যুদ্ধের বেশ কিছু বাস্তব ফুটেজও ব্যবহার করেছেন তিনি। এর ভেতরে আছে মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণের দৃশ্য, যোদ্ধাদের যুদ্ধে যাওয়ার দৃশ্য, ১৬ই ডিসেম্বরে ট্রাকে উল্লাসরত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে ফেরার দৃশ্য।

আলমগীর কবিরের জীবন
ধীরে বহে মেঘনা সিনেমার একটি দৃশ্য

‘ধীরে বহে মেঘনা’ থেকেই যাত্রা শুরু হয় মহান জীবনের দিকে। এরপর তিনি একে একে নির্মাণ করেন সূর্যকন্যা (১৯৭৬), সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), রূপালী সৈকতে (১৯৭৯), মোহনা (১৯৮২), পরিণীতা (১৯৮৪) ও মহানায়ক (১৯৮৫) সহ অসংখ্য প্রামাণ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

তার ‘সূর্যকন্যা’ সিনেমাটি একটি সাহসী সিনেমা। এই ছবিতে সমাজ ও ইতিহাসে নারীর অবস্থান তুলে ধরেন তিনি এবং সেটি অত্যন্ত সাহসীভাবে। এই ছবির কাহিনী, চরিত্র, গান, সংলাপ সবই ছিল চমৎকার ও ব্যতিক্রমী। কাহিনীটি ছিল এক কল্পনাপ্রবণ শিল্পী ভাস্করকে নিয়ে।ভাস্কর চরিত্রে ছিলেন বুলবুল আহমেদ। এই ভাস্কর তার নিজের তৈরি এক নারীমূর্তির প্রেমে পড়ে, এভাবে বাস্তবতা আর কল্পনার মিশ্রনে কাহিনী এগিয়ে যায়। এ ছবিতে এক দৃশ্যে আলমগীর কবির অ্যানিমেশনের সাহায্যে কিছু প্রতীকি দৃশ্য দেখিয়েছেন, যা ঐ সময়ে সম্পূর্ণ এক নতুন ব্যাপার ছিল। ছবিটির দুটি গান ‘আমি যে আঁধারে বন্দিনী’ আর ‘চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

আলমগীর কবিরের জীবন
আলমগীর কবির

মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তার ‘মোহনা’ ছবিটি পায় ‘ডিপ্লোমা অফ মেরিট’ সম্মাননা। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের শ্রেষ্ঠ ১০ বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের তালিকায় তার তিনটি সিনেমা স্থান পেয়েছে।

তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলামের মতো নির্মাতারা ছিলো তার সরাসরি ছাত্র। জীবনে সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি তিনি অসংখ্য বই, প্রবন্ধ লিখেছেন।

ফেরিঘাটের দুর্ঘটনায় বিদায়

১৯৮৯ সালের ১৯ জানুয়ারি একটি চলচ্চিত্র সংসদের উদ্বোধন ও আবু সাইয়ীদ নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আবর্তন’-এর একটি বিশেষ প্রদর্শনীতে আমন্ত্রিত হয়ে বগুড়ায় যান আলমগীর কবির। বগুড়ায় থেকে ২০ জানুয়ারি দুপুরের পর ঢাকার পথে রওনা হন। নিজেই ড্রাইভ করছিলেন। সন্ধ্যায় নগরবাড়ী ঘাটে ফেরিতে ওঠার জন্য পন্টুনের একপাশে অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ একটি ট্রাক ব্রেক ফেল করে সজোরে গাড়িটাকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দেয় আর চির বিদায় নেন বাংলাদেশের সিনেমা জগতের বটবৃক্ষ, চলচিত্রাচার্য আলমগীর কবির। আজ এই মহান নির্মাতার মৃত্যুদিন। মৃত্যুদিনে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।   

+ posts
Share this article
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Read next

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে স্মরণ – পর্দার অপু থেকে ফেলুদা

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় – আলো ছায়ার ভেতর দিয়ে হাঁটা এক দীর্ঘ জীবন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে স্মরণ ।…
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে স্মরণ - পর্দার অপু থেকে ফেলুদা

‘ও জান’ সিনেমায় জুটি হলেন সুনেরাহ-রেহান

মাইনাস ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় শুটিং এক স্বপ্নের শহর নেপালের মুস্তাং জেলার জমসম।  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২…
‘ও জান’ সিনেমায় জুটি হলেন সুনেরাহ-রেহান
0
Share