মসজিদ আল-আকসা’র ইতিহাস ….
মসজিদ আল-আকসা ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান (মক্কা ও মদিনার পর)। এটি অবস্থিত জেরুজালেমের পুরনো শহরে, হারাম আল-শরিফ বা নোবেল স্যাংচুয়ারি প্রাঙ্গণে। কুরআনে এই স্থানকে বলা হয়েছে “মসজিদুল আকসা”
“পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন…”
(সূরা আল-ইসরা, ১৭:১)
প্রাচীন যুগ
ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, আল-আকসার স্থানটি আদিকাল থেকেই ইবাদতের স্থান ছিল। কিছু বর্ণনায় বলা হয়, আদম (আ.) বা ইবরাহিম (আ.)-এর সময়েও এখানে ইবাদতের চিহ্ন ছিল। ঐতিহাসিকভাবে জেরুজালেম ইহুদি ও খ্রিস্টান ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, এখানে প্রথম ও দ্বিতীয় ইহুদি মন্দির নির্মিত হয়েছিল বলে ধরা হয়।
ইসলামের সূচনা ও কিবলা
ইসলামের শুরুর দিকে মুসলমানরা নামাজে জেরুজালেমের দিকেই (বাইতুল মাকদিস) মুখ করে দাঁড়াতেন। পরে মদিনায় কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ এলে কাবা শরিফের দিকে কিবলা নির্ধারিত হয় (সূরা আল-বাকারা, ২:১৪৪)।
এ ছাড়া হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও বিশেষভাবে সফর করা উচিত নয়: মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববি ও মসজিদুল আকসা (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম )।
মুসলিম শাসনামল
৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সময় জেরুজালেম মুসলমানদের অধীনে আসে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তিনি প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করে ইবাদতের ব্যবস্থা করেন।
উমাইয়া খিলাফতের সময় (৭ম–৮ম শতক) বর্তমান আল-আকসা মসজিদ ভবন নির্মিত ও সম্প্রসারিত হয়। একই প্রাঙ্গণে কুব্বাতুস সাখরা (ডোম অব দ্য রক) নির্মিত হয় (৬৯১–৬৯২ খ্রি., খলিফা আবদুল মালিকের আমলে), যা অনেক সময় ভুল করে “আল-আকসা” হিসেবে ধরা হয়, আসলে দুটো আলাদা স্থাপনা, তবে একই প্রাঙ্গণে।
ক্রুসেড ও পুনরুদ্ধার
১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করে। পরে ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি শহর পুনরুদ্ধার করেন এবং মসজিদ আল-আকসাকে আবার মুসলিম ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত করেন। পরবর্তী মমলুক ও উসমানি আমলে প্রাঙ্গণের সংস্কার, মাদরাসা ও স্থাপত্যিক উন্নয়ন হয়।
আধুনিক সময়
২০শ শতকে অঞ্চলটি রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পূর্ব জেরুজালেম ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে আসে, তবে আল-আকসা প্রাঙ্গণের ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা জর্ডান-সমর্থিত ইসলামিক ওয়াক্ফের হাতে রয়েছে, একে অনেকেই “স্ট্যাটাস কো” বলে উল্লেখ করেন।
আজও আল-আকসা মুসলমানদের কাছে ইবাদত, ইতিহাস ও পরিচয়ের প্রতীক; একই সঙ্গে এটি বিশ্ব রাজনীতির স্পর্শকাতর ইস্যু।
স্থাপত্য ও প্রাঙ্গণ
“আল-আকসা” শব্দটি অনেক সময় পুরো হারাম আল-শরিফ প্রাঙ্গণকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে আছে
- দক্ষিণ দিকের মূল আল-আকসা মসজিদ ভবন (ধূসর গম্বুজ)
- কুব্বাতুস সাখরা (সোনালি গম্বুজ)
- প্রাচীন প্রাচীর, ফোয়ারা, মাদরাসা ও অন্যান্য স্থাপনা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ভূমিকম্প) ও অগ্নিকাণ্ডের পর বিভিন্ন সময়ে সংস্কার হয়েছে।
সারসংক্ষেপ
মসজিদ আল-আকসা শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি বহু ধর্মের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক ভূখণ্ড, ইসলামের ইবাদত-ঐতিহ্যের অংশ এবং বিশ্ব-রাজনীতির স্পর্শকাতর প্রতীক। কুরআন-হাদিসে এর বিশেষ মর্যাদা উল্লেখিত, আর ইতিহাসের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও এটি মুসলমানদের হৃদয়ে অনন্য স্থান দখল করে আছে।


