বিশ্বজয়ের লক্ষ্য অ্যানিমেটরদের
বিশ্বব্যাপী অ্যানিমেশন শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে নিজেদের গল্প ও সংস্কৃতি পৌঁছে দিতে নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছেন এশীয় অ্যানিমেশন নির্মাতারা। চীন, ভারত এবং যুক্তরাজ্যের খ্যাতিমান অ্যানিমেটররা মনে করছেন, স্থানীয় সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ন রেখেও এমন গল্প বলা সম্ভব, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ সহজেই গ্রহণ করতে পারবেন।
সম্প্রতি সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (Shanghai International Film Festival) ফাঁকে এ বিষয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা তুলে ধরেন চীনা নির্মাতা ইউ শুই, ভারতের গীতাঞ্জলি রাও এবং ব্রিটিশ অ্যানিমেটর উইল বেচার। তারা সবাই উৎসবের গোল্ডেন গবলেট অ্যানিমেশন জুরির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
চীনা অ্যানিমেটর ইউ শুইয়ের সর্বশেষ চলচ্চিত্র নোবডি (Nobody) গত বছর চীনের বক্স অফিসে প্রায় ২১ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করে। এই সাফল্যে সন্তুষ্ট হলেও তিনি এখন বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছেন। বিশেষ করে চীনা অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নে ঝা ২ (Ne Zha 2)-এর অভূতপূর্ব সাফল্য তাকে এবং তার সমসাময়িক নির্মাতাদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছে।

স্থানীয় গল্পের বৈশ্বিক জয়, রেকর্ড ভাঙল ‘নে ঝা ২’
বিশ্বব্যাপী প্রায় ২২০ কোটি ডলার আয় করে নে ঝা ২ (Ne Zha 2) ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রে পরিণত হয়েছে। এই সাফল্য প্রমাণ করেছে যে স্থানীয় সংস্কৃতিনির্ভর গল্পও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে পারে।
ইউ শুই বলেন, “আমরা চাই আমাদের সংস্কৃতি বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছাক। তারা আমাদের গল্প দেখুক, বুঝুক এবং সেখান থেকে মানবিক মূল্যবোধের একটি সার্বজনীন বার্তা খুঁজে পাক। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
তার মতে, মার্কিন অ্যানিমেশন দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববাজারে আধিপত্য বজায় রেখেছে, কারণ তারা শুধু শক্তিশালী গল্পই নয়, কার্যকর বিতরণ ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে। তবে চীনা সিনেমাও এখন আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে। নে ঝা (Ne Zha) ছাড়াও ক্রুচিং টাইগার (Crouching Tiger), হিডেন ড্রাগন (Hidden Dragon), হিরো (Hero0 এবং ওয়ং কার-ওয়াইয়ের ইন দ্যা মুড ফর লাভ (In the Mood for Love)-এর মতো চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে।
স্থানীয় গল্প থেকে বিশ্বমঞ্চে, গীতাঞ্জলি রাওয়ের সাফল্যের গল্প
ভারতের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অ্যানিমেটর গীতাঞ্জলি রাও মনে করেন, বর্তমান যুগে অ্যানিমেশন নির্মাতাদের বৈশ্বিক দর্শকের কথা মাথায় রেখেই গল্প বলতে হবে। তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র বোম্বে রোজ (Bombay Rose) ২০১৯ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয় এবং পরে নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দর্শকদের কাছে পৌঁছে যায়।

রাও বলেন,
আমরা দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ বা আমেরিকান হাস্যরসের সঙ্গে পরিচিত। এখন সময় এসেছে মানুষ চীনা ও ভারতীয় হাস্যরসও বুঝতে শিখুক। বিশ্ব এখন অনেক বেশি সংযুক্ত। তাই প্রতিটি সাংস্কৃতিক বিষয় ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।
তিনি আরও বলেন, একটি গল্পে বিভিন্ন স্তর থাকা জরুরি। কিছু বিষয় বিশ্বের যেকোনো দর্শক বুঝতে পারবেন, আবার কিছু বিষয় নির্দিষ্ট সংস্কৃতির মানুষের কাছে বেশি অর্থবহ হবে। এই বহুমাত্রিকতাই একটি গল্পকে সমৃদ্ধ করে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ অ্যানিমেশন স্টুডিও আর্ডম্যানের পরিচালক উইল বেচার মনে করেন, কোনো চলচ্চিত্র কতটা আন্তর্জাতিক সাফল্য পাবে তা আগে থেকে বলা কঠিন। তার পরিচালিত A Shaun the Sheep Movie: Farmageddon চলচ্চিত্রটির প্রায় ৮০ শতাংশ আয় এসেছে যুক্তরাজ্যের বাইরে থেকে।
বেচার বলেন, “ছবিটি সম্পূর্ণ ব্রিটিশ ধাঁচের ছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষও এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। কারণ হাস্যরস, আবেগ এবং মানবিক অভিজ্ঞতার অনেক দিকই সার্বজনীন।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বৈশ্বিক অ্যানিমেশন বাজারের মূল্য প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার। সাম্প্রতিক সময়ে কেপপ ডিমন হান্টার (KPop Demon Hunters) এবং অস্কারজয়ী ফ্ল (Flow)-এর মতো আন্তর্জাতিক সাফল্য দেখিয়েছে যে ভালো গল্প ভাষা ও সংস্কৃতির সীমা অতিক্রম করতে পারে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় এশিয়ার অ্যানিমেশন নির্মাতারা এখন এমন গল্প বলার চেষ্টা করছেন, যা স্থানীয় সংস্কৃতির শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, আবার একই সঙ্গে বিশ্বের নানা প্রান্তের দর্শকের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে। তাদের বিশ্বাস, আন্তরিক গল্প, মানবিক অনুভূতি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঠিক সমন্বয়ই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অ্যানিমেশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।


