দ্বিগুণ আনন্দ মজুমদার পরিবারে
বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল নাম ফেরদৌসী মজুমদার। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তার অনবদ্য অবদান তাকে এনে দিয়েছে কিংবদন্তির মর্যাদা। আজ এই গুণী অভিনেত্রীর জন্মদিন। তবে দিনটির বিশেষত্ব শুধু এতেই সীমাবদ্ধ নয়। একই দিনে জন্মদিন উদযাপন করছেন তার কন্যা, জনপ্রিয় অভিনেত্রী ত্রপা মজুমদারও। ফলে দিনটি মজুমদার পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে দ্বিগুণ আনন্দের উপলক্ষ।
১৯৪৩ সালের ১৮ জুন বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন ফেরদৌসী মজুমদার। যদিও তাদের পৈতৃক নিবাস নোয়াখালীতে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকায়। ১৪ ভাই-বোনের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা ফেরদৌসীর সাংস্কৃতিক জগতে প্রবেশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার পরিবারে। তার বড় ভাই ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ কবীর চৌধুরী এবং মেজ ভাই শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী।

রক্ষণশীল পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠলেও ভাইদের উৎসাহ ও পরবর্তীতে স্বামী রামেন্দু মজুমদারের সহযোগিতায় সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। বিশেষ করে মুনীর চৌধুরীর অনুপ্রেরণাতেই মঞ্চনাটকে তার যাত্রা শুরু। পরে মুনীর চৌধুরীর লেখা নাটক ‘একতলা দোতলা’র মাধ্যমে টেলিভিশন নাটকে অভিষেক ঘটে তার। সেখান থেকে শুরু হয় অভিনয়ের দীর্ঘ ও গৌরবময় পথচলা।
মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটক এবং চলচ্চিত্র, তিন ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতায় কাজ করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন ফেরদৌসী মজুমদার। তার অভিনয়গুণ ও সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাগুলোর মধ্যে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা।

অন্যদিকে ১৯৭৩ সালের ১৮ জুন জন্মগ্রহণ করেন ত্রপা মজুমদার। সংস্কৃতিমনা পরিবারে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় তার। বাবা-মায়ের পথ অনুসরণ করে তিনি মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রেও নিজের অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ত্রপা মজুমদার নিজস্ব পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। যদিও তিনি কিংবদন্তি দুই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু ও ফেরদৌসী মজুমদারের কন্যা, তবুও নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অভিনয়াঙ্গনে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন। এখনও মঞ্চনাটককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি এবং নিয়মিত নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
বছর কয়েক আগে এক সাক্ষাৎকারে ফেরদৌসী মজুমদার বলেছিলেন, জীবনের প্রথম দিকে জন্মদিন নিয়ে তেমন কোনো বিশেষ আয়োজন বা সচেতনতা ছিল না। এমনকি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি খেয়ালই করেননি যে মা ও মেয়ের জন্মদিন একই দিনে। ত্রপার বয়স যখন ছয়-সাত বছর, তখন বিষয়টি তার নজরে আসে। এরপর থেকেই দিনটি তাদের পরিবারের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করতে শুরু করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী এবং সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষেরাও জানতে পারেন। ফলে প্রতিবছর ১৮ জুন এলে শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও অভিনন্দনে ভরে ওঠে তাদের দিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভক্ত-অনুরাগীরা শুভেচ্ছা জানিয়ে থাকেন এই দুই গুণী শিল্পীকে।
একই দিনে জন্মদিন হওয়া বিরল ঘটনা হলেও ফেরদৌসী ও ত্রপা মজুমদারের ক্ষেত্রে এটি শুধু একটি কাকতালীয় বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দুই প্রজন্মের প্রতিনিধির এক অনন্য বন্ধনের প্রতীক। মা-মেয়ের এই বিশেষ দিনে সংস্কৃতিপ্রেমীদের পক্ষ থেকেও রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।