গন্ধম ফলের যাতনা
চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে রাত্রিযাপন ও অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে সরকার ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ও বর্তমানে ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়ানোর বিষয়টিকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে এনে গুরুদণ্ড তাঁকে এই শাস্তি প্রধান করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, সাকলায়েন আসলে কি ভিক্টিম? যদি হয়ে থাকে তাহলে পরীমণি কি এডিসি সাকলায়েনকে সরি বলবেন?
বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব বেশি নেই, যেখানে একজন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা এবং একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত একজনের চাকরি জীবনের সমাপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যার অন্যতম হল-পরীমণি সাকলায়েনকে সরি বলবেন কিনা।

আসলে প্রশ্নটি যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে আরো জটিল। এই প্রশ্নের ভেতরে লুকিয়ে আছে দায়, নৈতিকতা, ক্ষমতা, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক বিচারের জটিল হিসাব।
সরি বলার প্রশ্নটি কেন উঠছে?
কারণ ঘটনাটির শেষ পরিণতি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে সাকলায়েনের জীবনে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তার দীর্ঘ কর্মজীবন কার্যত শেষ হতে যাচ্ছে। তিনি চাকরি হারাচ্ছেন। তার ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার সামাজিক পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ফলে অনেকের মনে হচ্ছে, যে সম্পর্কে দুজন মানুষ ছিলেন, তার পরিণতির বোঝা কেন একা একজন বহন করবেন? সেখান থেকেই জন্ম নেয়-“পরীমণি কি অন্তত দুঃখ প্রকাশ করবেন না?”
কিন্তু এখানেই আসে প্রথম জটিলতা। সরি বলা সাধারণত তখনই আসে, যখন কেউ অন্য কারও প্রতি অন্যায় করেছে বলে স্বীকার করে। তাহলে প্রশ্ন হলো- পরীমণি কি সাকলায়েনের প্রতি কোনো অন্যায় করেছেন?
আইনের চোখে দায় কার?
সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে যে অভিযোগগুলো এসেছে, সেগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু সাকলায়েন নিজেই। তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি ছিলেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তিনি ছিলেন সরকারি কর্মচারী। রাষ্ট্র তার ওপর একটি বিশেষ নৈতিক মানদণ্ড আরোপ করেছিল। পরীমণি কোনো সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না। তার ওপর সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি প্রযোজ্য ছিল না। ফলে প্রশাসনিক বিচারে দায়টি মূলত সাকলায়েনের কাঁধেই বর্তায়। এই বাস্তবতায় পরীমণির কাছে “সরি” দাবি করা বলা যায় অযৌক্তিক।
সাকলাইন কি নিজেকেই সরি বলবেন?
মনোবিশ্লেষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন, মানুষের ব্যক্তিত্ব তিনটি শক্তির মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্বের ফল- ইড, ইগো এবং সুপারইগো।
ইড হলো আদিম কামনা-বাসনা ও তাড়না। এটি আনন্দ চায়, তৃপ্তি চায়, এখনই চায়। সুপারইগো হলো নৈতিকতা, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং বিবেকের প্রতিনিধিত্ব। আর ইগো এই দুই শক্তির মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করে।

সাকলায়েনের ঘটনা যদি ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণে দেখা হয়, তাহলে মনে হতে পারে তার ইড এবং সুপারইগোরর সংঘাতে ইগো পরাজিত হয়েছে। তিনি ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, বিবাহিত, সন্তানের পিতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি। অর্থাৎ তার সুপারইগো বা সামাজিক দায়িত্ববোধ অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার কথা। কিন্তু মানুষের ভেতরে আরেকটি শক্তি কাজ করে যার নাম আকাঙ্ক্ষা। ফ্রয়েডের মতে, সভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ইতিহাস। কিন্তু কখনও কখনও সেই প্রবৃত্তিই সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেয়।
এই বিষয়টি আমলে নিয়ে বোঝা যায়, পরীমণি হল রইদ সিনেমার সেই তাল যা সাকলাইন বারবার কুড়াইতে যায়। সাকলাইন নিজেই তাঁর নিজের অচেতন আকাঙ্ক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল “হিউব্রিস” অর্থাৎ অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা আত্মনিয়ন্ত্রণের ভ্রান্ত ধারণা। ক্ষমতাবান মানুষ প্রায়ই মনে করেন তারা নিয়মের ঊর্ধ্বে। তারা বিশ্বাস করেন, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
সাকলায়েন হয়তো ভেবেছিলেন, একজন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সবকিছু সামাল দিতে পারবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এমন এক পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়লেন যা তার কর্মজীবনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
আকাঙ্ক্ষার যাতনা
এক্ষেত্রে জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার বেশ প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, “মানুষ যা চায় তা করতে পারে, কিন্তু সে কী চাইবে তা নির্ধারণ করতে পারে না।”
অর্থাৎ মানুষ তার কাজের জন্য দায়ী, কিন্তু তার আকাঙ্ক্ষার উৎপত্তি অনেক সময় তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সাকলায়েন তাঁর নিজের ইচ্ছার মালিক ছিলেন, এবং একটা পর্যায়ে দায়িত্ব ভুলে গিয়ে হয়েছেন ফ্রয়েডের ইড কিংবা নিজের ইচ্ছার কাছে, আদিম প্রবৃত্তির কাছে বন্দী।
ফলে, বলা যায় এডিসি সাকলায়েনকে সরি বলার খুব একটা প্রয়োজন পরীমণির নেই। সাকলাইন গন্ধম ফল খেয়েছে, ফলাফল তাঁকে একাই পেতে হবে।


