জাফর পানাহির শাস্তি
ইরানীয় চলচ্চিত্র পরিচালক জাফর পানাহি আবারও আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন। রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দেওয়া এক বছরের কারাদণ্ড ও দুই বছরের বিদেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার রায় বহাল রেখেছে ইরানের আদালত। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মহলে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, পানাহির আইনজীবী মোস্তফা নিলি নিশ্চিত করেছেন যে, তেহরান রেভুলেশনারি কোর্ট নির্মাতার পক্ষ থেকে উত্থাপিত আপত্তি খারিজ করে আগের রায় বহাল রেখেছে। তবে ইরানি আইন অনুযায়ী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য তার হাতে ২০ দিনের সময় রয়েছে।
পানাহির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ইরানের শাসনব্যবস্থার সমালোচনামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণ, রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি সমর্থন জানানো, সরকারবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পোস্ট প্রকাশ করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্দোলন ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচিত। আন্দোলনটি দেশটির নারী অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার দাবিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছিল।
জানা গেছে, পানাহি যখন তার নতুন চলচ্চিত্র ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ এর প্রচারণার জন্য বিদেশে অবস্থান করছিলেন, তখনই তার অনুপস্থিতিতে আদালত এই রায় প্রদান করে। পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরে আইনি লড়াই চালালেও আদালত শেষ পর্যন্ত আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
রায়ের অংশ হিসেবে তাকে শুধু কারাদণ্ডই নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক বছর তার জনপরিসরে সক্রিয় অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ ছিল ২০২২ সালে কারামুক্ত হওয়ার পর পানাহির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। সে বছর তাকে তেহরানের ইভিন প্রিজন কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল। প্রায় ৮৬ দিন কারাভোগের পর অনশন ও আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তিনি মুক্তি পান।

চলচ্চিত্রটির কাহিনি এক সাবেক রাজনৈতিক বন্দিকে ঘিরে আবর্তিত, যিনি এমন একজন ব্যক্তিকে অপহরণ করেন, যাকে তিনি নিজের নির্যাতনকারী বলে বিশ্বাস করেন। এরপর প্রতিশোধ, ন্যায়বিচার এবং ক্ষমার প্রশ্নে বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে নৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানবিক সংকটকে গভীরভাবে তুলে ধরার কারণে চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।
চলচ্চিত্রটি প্রথম প্রদর্শিত হয় কান চলচ্চিত্র উৎসবে, যেখানে এটি সর্বোচ্চ সম্মান পাম দ’র (Palme d’Or) অর্জন করে। পরে এটি সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে একাডেমি পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করে। পাশাপাশি পানাহি ও তার সহ-চিত্রনাট্যকাররাও সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য বিভাগে মনোনীত হন।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বিধিনিষেধ, সেন্সরশিপ ও আইনি বাধার মুখোমুখি হলেও জাফর পানাহি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানি চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার চলচ্চিত্রগুলো মানবাধিকার, সামাজিক বৈষম্য এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন তুলে ধরার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
সর্বশেষ রায় তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই আশা করছেন, আপিল প্রক্রিয়ায় তিনি আইনি স্বস্তি পাবেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ অব্যাহত রাখতে পারবেন।