অভিনয়ের জাদুঘর হুমায়ূন ফরীদি
হুমায়ূন ফরীদির জন্মদিন আজ। হাসিকে অস্ত্র বানানো এক কিংবদন্তি এক অভিনেতা। হুমায়ূন ফরীদির জন্মদিন এলেই বাংলা অভিনয়ের এক স্বর্ণালি সময়ের কথা মনে পড়ে। হুমায়ূন ফরীদির জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভক্ত-অনুরাগীরা জানাচ্ছেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বাংলা অভিনয়ের ইতিহাসে কিছু নাম উচ্চারণ করলেই যেন ভেসে ওঠে একেকটি সময়, একেকটি আবহ। হুমায়ূন ফরীদি তেমনই এক নাম, যিনি অভিনয়ের সংজ্ঞাকেই নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য উচ্চতায়।

পুরান ঢাকায় জন্ম নেওয়া এক নক্ষত্র
১৯৫২ সালের ২৯ মে পুরান ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন কামরুল ইসলাম। পরে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অভিনয় অঙ্গনের কিংবদন্তি হুমায়ূন ফরীদি। তাঁর বাবার নাম এ টি এম নূরুল ইসলাম এবং মা বেগম ফরিদা ইসলাম। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
পরিবারের চাকরিগত কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তাঁর। ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার প্রতি ছিল আলাদা আগ্রহ। সেই আগ্রহই পরবর্তীতে তাঁকে অভিনয়ের জগতে নিয়ে আসে।

মুক্তিযুদ্ধের কারণেই থেমেছিল পড়াশোনা
১৯৬৮ সালে ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ১৯৭০ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনে বিরতি আসে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন হুমায়ূন ফরীদি। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই নাটকের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আরও গভীর হয়।
সেলিম আল দীনের সঙ্গে পথচলা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নাট্যকার সেলিম আল দীনের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। সেই পরিচয়ই বদলে দেয় তাঁর জীবনের পথ। তিনি যুক্ত হন মঞ্চনাটকের দল ‘ঢাকা থিয়েটার’ এর সঙ্গে।
১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যোৎসবের অন্যতম সংগঠক ছিলেন হুমায়ূন ফরীদি। ওই উৎসবে তাঁর নিজের রচনা ও নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় ‘আত্মস্থ ও হিরন্ময়ীদের বৃত্তান্ত’ নাটকটি। নাটকটি সে সময় ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল।

নাটক থেকে চলচ্চিত্রে উত্থান
আশির দশকে নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড়পর্দায় যাত্রা শুরু করেন হুমায়ূন ফরীদি। এরপর ধীরে ধীরে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অপরিহার্য নাম হয়ে ওঠেন।
ভিলেন, চরিত্রাভিনেতা কিংবা কেন্দ্রীয় চরিত্র সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অনবদ্য। অভিনয়ে তাঁর স্বাভাবিকতা দর্শকদের মুগ্ধ করত। সংলাপ বলার শক্তিশালী ভঙ্গি তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয়
হুমায়ূন ফরীদি অভিনীত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের তালিকাও দীর্ঘ। ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘ভণ্ড’, ‘ঘাতক’, ‘ব্যাচেলর’, ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘দহন’, ‘অধিকার চাই’ ও ‘সন্ত্রাস’সহ বহু সিনেমায় অভিনয় করে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন।
চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। নেতিবাচক চরিত্রেও তিনি এনে দিতেন আলাদা মাত্রা। ফলে দর্শকরা তাঁর অভিনয় সহজেই মনে রাখতেন।

নাট্যাঙ্গনেও ছিলেন সমান জনপ্রিয়
শুধু চলচ্চিত্র নয়, টেলিভিশন নাটকেও হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘সংশপ্তক’, ‘নিখোঁজ সংবাদ’, ‘হঠাৎ একদিন’ ও ‘পাথর সময়’ এর মতো নাটকে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।
তাঁর অভিনয়ে চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে উঠত। দর্শকরা সহজেই চরিত্রের আবেগ অনুভব করতে পারতেন। তাই আজও তাঁর নাটকগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়।

পুরস্কার ও স্বীকৃতিতে ভরা ক্যারিয়ার
‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন হুমায়ূন ফরীদি। অভিনয়ে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।
দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছেন নিজস্ব এক ধারা, যা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদেরও অনুপ্রাণিত করে।

অপূরণীয় শূন্যতা রেখে বিদায়
২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান হুমায়ূন ফরীদি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। তবে মৃত্যুর পরও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি।
বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে তিনি যে শূন্যতা তৈরি করে গেছেন, তা আজও পূরণ হয়নি। অভিনয়ের জগতে হুমায়ূন ফরীদি একটি ইতিহাস, একটি আবেগ এবং একটি অনন্ত স্মৃতি হয়ে রয়েছেন।