কারিনার মরদেহ আসবে রোববার, সোমবার দাফন মুন্সিগঞ্জে
কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে তারকা অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, সহকর্মী এবং ভক্তরা। মাত্র ৩০ বছর বয়সে কারিনা কায়সারের মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। একসময় প্রাণবন্ত উপস্থিতি, হাস্যরস আর সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব দিয়ে যিনি মানুষের মন জয় করেছিলেন, সেই মানুষটিকেই এখন স্মরণ করা হচ্ছে অশ্রুসিক্ত নয়নে।

কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারের মরদেহ রোববার ভারত থেকে দেশে আনা হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর বাবা কায়সার হামিদ। তিনি জানান, রোববার দুপুরে কারিনা কায়সারের মরদেহ দেশে পৌঁছাবে। এরপর বাদ আসর বনানী ডিওএইচএস জামে মসজিদ প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
মেয়ের মৃত্যুতে কায়সার হামিদের আবেগঘন স্ট্যাটাস
মেয়ে কারিনার মৃত্যুতে আবেগঘনস্ট্যাটাস দিয়েছেন বাবা ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় কায়সার হামিদ। তিনি লেখেন, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, যে আমার প্রাণপ্রিয় আদরের মেয়ে কারিনা কায়সার একটু আগে চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেছে।’

স্ট্যাটাসে তিনি আরও লেখেন, ‘আমার মেয়ের কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে কিংবা কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে আপনারা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। যারা এই দুঃসময়ে আমাদের পাশে ছিলেন, দোয়া করেছেন, সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দোয়া করবেন সবাই, আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুক।’
মৃত্যুতেও উল্লাস করে কিছু লোক: ফেসবুকে ফারুকী
কারিনা কায়সারের মৃত্যুর খবরে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি শুধু শোক প্রকাশই করেননি, সমাজের কিছু মানুষের অমানবিক আচরণ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেন, মানুষ হত্যাই নয়, মৃত্যুতেও উল্লাস করে কিছু লোক।”

কারিনাকে নিয়ে আবেগঘন স্মৃতিচারণ
কারিনাকে নিয়ে দেওয়া দীর্ঘ স্ট্যাটাসে ফারুকী স্মরণ করেছেন তাঁদের ব্যক্তিগত কিছু মুহূর্ত। তিনি লেখেন, “যখন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ডাক আসছিল, তুমি নির্দ্বিধায় দাঁড়াইছিলা, কারিনা। বাংলাদেশ তোমাকে মনে রাখবে। আর আমি মনে রাখবো তোমার উইটের কারণে, তোমার ডিলাইটফুল প্রেজেন্সের কারণে।”
ফারুকী আরও উল্লেখ করেন, প্রথমবার কারিনা তাঁদের বাসায় গেলে তিনি ও অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সঙ্গে ছবি তুলতে চেয়েছিলেন। কারিনা জানিয়েছিলেন, তিনি তাঁদের ভক্ত। কিন্তু পাল্টা জবাবে ফারুকী ও তিশা বলেন, তাঁরা বরং কারিনারই ভক্ত। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ফারুকী বলেন, কারিনা তখন লজ্জা পেয়ে হেসেছিলেন।
স্ট্যাটাসের শেষ অংশে ফারুকী যে মন্তব্য করেছেন, সেটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। তিনি লেখেন, “এই পোস্টে যদি হাহা দেখো, জানবা কিছু লোক শুধু মানুষ হত্যার জন্যই বিখ্যাত তা না, মৃত্যুতেও উল্লাস করার জন্য বিখ্যাত। ইউ নো দেম, বাংলাদেশ নোজ দেম।” সামাজিক মাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, মতপার্থক্য বা সমালোচনা থাকতেই পারে, কিন্তু মৃত্যু নিয়ে উল্লাস করা মানবিকতার চরম অবক্ষয়।

কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে কাঁদছে দিঘি
কারিনার মৃত্যুতে শুধু ফারুকী নন, শোক প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী প্রার্থনা ফারদিন দীঘি। সামাজিক মাধ্যমে কারিনার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের ছবি শেয়ার করে দেন আবেগঘন বার্তা। তিনি লেখেন, “কারিনা আপু তুমি না আমাকে সেদিন কল দিয়ে বললে দীঘি আমি কিন্তু বিদায় ফার্স্ট ডেই দেখব। তুমি না আমার সাথে ঘুরতে যেতে চাইলে। আপু প্রত্যেকটা কথা আমার কানে বাজতেছে।”

কারিনাকে নিয়ে সাদিয়া আয়মানের স্মৃতিচারণ
অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মানও কারিনার সঙ্গে মেসেঞ্জারের শেষ কথোপকথনের স্ক্রিনশট শেয়ার করেন। তিনি জানান, মাত্র এক মাস আগেও কারিনা তাঁকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে তাঁর কাজের প্রশংসা করেছিলেন।
সাদিয়া লেখেন, “ভাবতেও পারিনি সেটাই আমাদের শেষ কথা হবে। তুমি সত্যিকারের একজন ভালো মানুষ ছিলে। আল্লাহ তোমাকে জান্নাত নসিব করুন।”

নুসরাত ফারিয়া ও তমা মির্জার আবেগঘন প্রতিক্রিয়া
চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়া কারিনার সঙ্গে একটি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছিলেন। সেই স্মৃতি মনে করে তিনি লিখেছেন, “এটা খুবই দুঃখজনক! সে কত অসাধারণ এক প্রতিভা ছিল! বাংলাদেশ তোমাকে মিস করবে।”
অন্যদিকে অভিনেত্রী তমা মির্জা তাঁর পোস্টে ‘আহারে জীবন’ গানের লাইন উল্লেখ করে লিখেছেন, “আহারে জীবন, আহা জীবন জলে ভাসা পদ্মা যেমন।”
রাকিন আবসারের ব্যতিক্রমী বিদায়বার্তা
জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিন আবসারও কারিনার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, “মোমবাতিতে ভরা একটি ঘরে তুমি ছিলে ঝাড়বাতির মতো, কারিনা। আল্লাহ হাফেজ, আবার দেখা হবে।”

মৃত্যুর পর যে ছবি প্রকাশ করতে বলেছিলেন কারিনা
কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে সামাজিক মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন উপস্থাপক রুম্মান রশীদ খান। কারিনার একটি ছবি প্রকাশ করেছেন তিনি। যেটি সদ্য প্রয়াত এ কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার মৃত্যুর পর প্রকাশ করতে বলেছিলেন।
শুক্রবার দিবাগত রাতে কারিনার মৃত্যুর পর সে ছবি প্রকাশ করেন রুম্মান। সাদাকালো ছবিটিতে কারিনার দৃষ্টি রাস্তায়। মুখে এক চিলতে হাসি। ছবিটি প্রাকশ করে ক্যাপশনে রুম্মান লেখেন, কারিনার এই ছবিটি তুলে যখন সাদা-কালো এফেক্ট দিয়ে হোয়াটসআপ করেছিলাম। কারিনা বলেছিলেন, ‘ওয়াও! কী জোস! আমাকে তো নায়িকা নায়িকা লাগছে। আমি মারা যাবার পর এই ছবিটা দিয়েন!’!’

দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন কারিনা
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন কারিনা কায়সার। প্রথমে সাধারণ শারীরিক সমস্যা মনে হলেও পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁর শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি হেপাটাইটিস এ এবং ই-তে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
আগে থেকেই তাঁর ফ্যাটি লিভারের সমস্যা ছিল। সংক্রমণের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর লিভার ফেইলিউর হয়। কারিনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতের চেন্নাইয়ে নেওয়া হয়।
ভেলোরের খ্রিস্টান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসকেরা প্রথমে ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শুক্রবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
কারিনা কায়সারের পরিচয় ও কাজ
কারিনা কায়সার মূলত কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অভিনয় ও চিত্রনাট্য লেখার কাজেও ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘ইন্টার্নশিপ’ ও ‘৩৬-২৪-৩৬’।
মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ারেই তিনি তরুণ দর্শকদের মধ্যে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ও অভিনয়ের স্বতন্ত্র ভঙ্গি তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
কারিনা কায়সার তাঁর মা-বাবা ও দুই ভাই রেখে গেছেন। তাঁর দাদি দেশের বরেণ্য দাবাড়ু রানী হামিদ। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি তাঁর ভক্ত-অনুরাগীরাও এই মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছেন।
সামাজিক মাধ্যমে এখনো চলছে কারিনা কায়সারের মৃত্যু চলছে নিয়ে স্মৃতিচারণ। কেউ তাঁর হাসির কথা বলছেন, কেউ বলছেন তাঁর আন্তরিকতার কথা। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না, এতো অল্প বয়সে এমন প্রাণবন্ত একজন মানুষ চলে যেতে পারেন। কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে শোকাহত পুরো বিনোদন অঙ্গন।