নায়করাজ’ আব্দুর রাজ্জাক
নায়করাজ রাজ্জাক কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন খালি হাতে। সাথে ছিলো মাত্র একটি চিঠি। আর সেই খালি হাতে একটি চিঠি নিয়েই পরবর্তীকে রাজ্জাক হয়ে উঠলেন নায়করাজ রাজ্জাক। কিভাবে কলকাতার ছেলে ঢাকাই চলচ্চিত্রে নায়করাজ হয়ে উঠলেন?
গত ২৩ জানুয়ারি ছিলো ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা ‘নায়করাজ’ আব্দুর রাজ্জাকের জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ৮৪ বছর। তবে প্রয়াত এই মহান শিল্পীর জন্মদিনে হয়নি কোনো বড় আয়োজন। পরিবারিকভাবেই দিনটি স্মরণ করা হয়েছে।

১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রাজ্জাক। রাজ্জাকের জন্ম কলকাতায়। শৈশব ও ছেলেবেলা কেটেছে সেখানেই। স্কুলজীবন থেকে অভিনয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন তিনি। কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় একবার সরস্বতী পূজায় মঞ্চনাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাকে ‘বিদ্রোহী’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে নির্বাচন করেন। সেখানে তিনি গ্রামীণ কিশোরের চরিত্রে অভিনয় করেন, যা তার অভিনয় জীবনের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
সেই সুবাদে স্কুলের বার্ষিক নাটকে তার উপস্থিতি থাকতোই। এভাবেই কলকাতায় রাজ্জাকের অভিনয় শুরু। তিনি একসময় চিন্তা করেছিলেন সিনেমায় অভিনয় করবেন। পর পর তিনটি সিনেমায় অভিনয় করেন খুবই ছোট ছোট চরিত্রে। সিনেমাগুলি হলো ‘শিলালিপি’, ‘পঙ্কতিলক’, ‘রতন পাল বংগালী’।
তরুণ বয়সে রাজ্জাক বম্বেতেও গিয়েছিলেন। সেখানে ছিলেন দুই মাস। যে স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন তা পূরণ করতে পারেননি। ফের কলকাতায় ফিরে অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে দিন কাটতে থাকে তার। কিন্তু অভিনয় ভুলতে পারেননি। পরিচালকদের পেছনে ঘুরতে থাকেন। সুযোগ আসে না।
কিছুদিন চাকরিও করেছিলেন কলকাতায়। মাত্র উনিশ বছর বয়সে বিয়েও করেন। স্ত্রী লক্ষ্মীকে নিয়ে কাটতে থাকে দিন, কিন্তু অভিনয়ের নেশা যেনো কাটে না।
রাজ্জাক কলকাতা থেকে ঢাকায় এলেন চিঠি নিয়ে
১৯৬৪ সালে ছেলের বাবা হয়েছেন। ছেলে বাপ্পারাজ ও স্ত্রী লক্ষ্মীকে নিয়ে কলকাতা ছেড়ে পাড়ি জমান ঢাকা শহরে। সে সময়ে ঢাকায় তার কেউ ছিলো না। ঢাকায় এসে কমলাপুরে ত্রিশ টাকার ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন তিনি। ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকার কমলাপুরে এসে নামেন রাজ্জাক। সে সময়ে উপমহাদেশে দাঙ্গাও চলছিলো। ঢাকায় আসার সম্বল ছিলো একটি চিঠি।
কলকাতা থেকে ঢাকার চিত্র পরিচালক আবদুল জব্বার খানের কাছে ওখানকার নাট্যপরিচালক পীযুষ বসু লিখে দিয়েছিলেন চিঠিটি। চিঠির বিষয় ছিলো- রাজ্জাক যেনো অভিনয় করতে পারে।

চিঠিটিই ছিলো সে সময়ে রাজ্জাক এর সম্বল। আর চোখে মুখে ছিলো স্বপ্ন। ছিলো হতাশাও। অস্থিরতাও ছিলো। তারপরও রাজ্জাক পিছপা হননি।
চিঠি নিয়ে দেখা করার পর পরিচালক আবদুল জব্বার খান সেই সময়ের কয়েকজন নামকরা পরিচালকের কাছে রাজ্জাককে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
রাজ্জাক ঢাকার চলচ্চিত্রজীবনে যেভাবে শুরু করলেন
তারপর আবদুল জব্বার খান রাজ্জাককে পাঠিয়েছিলেন ইকবাল ফিল্মসে। সেখান থেকে নির্মিত হয়েছিলো ‘উজালা’। কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘উজালা’য় সহকারী পরিচালক হিসেবে ঢাকায় নতুন জীবন শুরু করেছিলেন রাজ্জাক। সহকারী পরিচালক হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য কাজ করতে থাকলেও রাজ্জাকের মন পড়ে থাকতো অভিনয়ের প্রতি। তারপর ছোট-ছোট চরিত্রে অভিনয় দিয়ে এদেশের সিনেমায় ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন রাজ্জাক। ‘ডাক বাবু’, ‘কার বউ’, ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’ সিনেমাতেই ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এক সময়ে সুযোগ এসে যায় তার। বিখ্যাত নির্মাতা জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিষেক ঘটে। রাজ্জাক নায়িকা হিসেবে পান সুচন্দাকে।

‘বেহুলা’ দর্শকরা গ্রহণ করেন। রাজ্জাক নামটি নায়ক হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর রাজ্জাক ও সুচন্দাকে জুটি করে জহির রায়হান নির্মাণ করেছিলেন ‘আনোয়ারা’। বিখ্যাত লেখক মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন রচিত ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস থেকে নির্মিত সিনেমাটিতে আনোয়ারার স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করার পর দর্শকরা পেয়ে যায় নতুন এক রাজ্জাককে। এরপর ‘সুয়োরাণী দুয়োরাণী’ সিনেমায়ও তিনি নায়ক হয়ে আসেন।
সফলতার গল্প ঘরে আসতে শুরু করে রাজ্জাকের। পরিচালকরা তাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। পরিচালকদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে থাকা রাজ্জাকের ভাগ্য বদলে যেতে থাকে। সিনেমার পেছনে তিনি দৌড়েছিলেন। এখন সিনেমা তার পেছনে দৌড়াতে থাকে।
রাজ্জাক হয়ে উঠেন ঢাকার সিনেমার সেই সময়ের এক নম্বর নায়ক। তার নামের আগে যোগ হয় রাজ উপাধি। সামাজিক, রোমান্টিক, লোককাহিনী, অ্যাকশন- সব ঘরনার সিনেমায় রাজ্জাক নায়ক হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন সময়ের পলচলায়।
শুধু কী তাই? সে সময়ের সব শীর্ষ নায়িকার বিপরীতে নায়করাজ রাজ্জাক সফল নায়ক ছিলেন। তবে রাজ্জাক-কবরী জুটিই বেশি আলোচিত হয়েছিলো।
রাজ্জাক এর ঢাকায় প্রতিপত্তি
শূন্য হাতে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসা সেই রাজ্জাক সময়ের ব্যবধানে একসময় গুলশানে বাড়ি করেন। প্রতিষ্ঠা করেন রাজলক্ষ্মী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠা করেন রাজলক্ষ্মী কমপ্লেকস। অভিনয়, প্রযোজনা, ব্যবসা, পরিচালনা, সংসার– সবকিছু সামলিয়ে রাজ্জাক টানা কয়েকটি দশক ঢাকাই চলচ্চিত্রের রাজা হয়েছিলেন।

সাদাকালো যুগ থেকে রঙিন পর্দা-দুই সময়েই অসামান্য অভিনয় দিয়ে তিনি বাংলা সিনেমায় নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে অর্জন করেন ‘নায়করাজ’ উপাধি।
তিনি প্রায় তিন শতাধিক বাংলা ও কয়েকটি উর্দু চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন এবং ১৬টি সিনেমা পরিচালনা করেন।
চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৫ সালে তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট এই কিংবদন্তি অভিনেতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।


