সোহেল রানার প্রেমের কথা
ঢাকাই সিনেমার এক সময়ের জনপ্রিয় নায়ক সোহেল রানা। যিনি পরে প্রযোজনাও করেছেন বেশ কিছু সিনেমায়। সম্প্রতি তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনের এক রঙিন ও গোপন প্রেমের স্মৃতি সামনে এনেছেন। যা অপ্রকাশিত ছিলো গত ৫০ বছর ধরে। মনে মনে এই স্মৃতি তিনি লালন করে এসেছেন গভীর গোপন বেদনা নিয়ে। তার জীবনের এই আলো আধারীর নাম সোমা মুখার্জী। অবশেষে সোহেল রানা ৫০ বছর পর গোপন প্রেমের কথা সামনে আনলেন ।
ঘটনার শুরু হয় ১৯৭৫ সালের নির্মিত সিনেমা ‘এপার ওপার’ এর শুটিং এর শুরু থেকেই। সেই সিনেমার পরিচালক ও প্রযোজক এমনকি নায়কও ছিলেন সোহেল রানা। আর তার বিপরীতে নায়িকা হিসেবে ছিলেন ভারতীয় নায়িকা সোমা মুখার্জী। সোহেল রানার ভাষ্যে তার তখন ১৪-১৫ বয়স।

মাত্র তিন মাসেই সিনেমাটির শুটিং শেষ হয়। আর এই শুটিং চলাকালীন তাদের মধ্যে গড়ে উঠে স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি কিছু। প্রণয়। শুটিংয়ের শুরুর দিকে সোমা মুখার্জীকে নিয়ে বেশ ঝামেলাতেই পড়তে হয় সোহেল রানাকে। কারণ সিনেমার ক্যামেরাম্যান লতিফ বাচ্চু জানান তিনি এই নায়িকাকে কিভাবে ক্যামেরার ফ্রেমে ধারণ করবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না। অর্থাৎ নায়িকার গ্ল্যামারে ঘাটতি রয়েছে। ক্যামেরাম্যান সোহেল রানাকে বলেন,’ বস, কোন এঙ্গেলে শট ধরবো এটাই তো আমি বুঝতে পারতেসি না। আমি কোন এঙ্গেলেই তার সুন্দর খুঁজে পাচ্ছি না।‘
বেশ চিন্তায় পরে গেলেন সোহেল রানা। এরপর তিনি ঢাকাই সিনেমার খলনায়ক খলিলুর রহমানকে অনুরোধ করেন নায়িকাকে দেখে আসতে। যথারীতি তিনিও গেলেন কথা বললেন এবং ফিরে এসে সোহেল রানাকে জিজ্ঞেস করলেন সে এই নায়িকাকে দিয়েই অভিনয় করাবেন কিনা। উত্তরে সোহেল রানা সোমাকেই অভিনয় করাবেন বলে জানান। এই সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে খলিলও জানান তিনি যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছেন তাহলে তার কিছু বলার নেই। সোমাকে নিলে কিংবা না নিলেও তার আপত্তি কিংবা সম্মতি কোনটাই নেই।

৫০ বছর এর গোপন প্রেমের শুরুর কথা
এরপরে শুরু হয় সিনেমার শুটিং। শুটিং চলাকালীন এক রাতে ঘটে অন্যরকম ঘটনা। রাত ১০টার পরে খড়কুটো দিয়ে সাজানো একটি জায়গায় বসে এই গ্ল্যামারবিহীন নায়িকা হারমোনিয়ামে গান তুলেছেন আর দূর থেকে তা শুনে বেশ অবাক হন সোহেল রানা। তিনি তখনো জানতেন না কে বাজাচ্ছেন আর গাইছেন এমন সুন্দর গান। তার এই প্রতিভা দেখে আপ্লূত হয়ে পড়েন সোহেল রানা সহ সিনেমাসংশ্লিষ্ট সকলেই। নায়িকার এই গুণই সোহেল রানার হৃদয়ে গভীর দোলা দেয়।

সোহেল রানা ওই সাক্ষাৎকারে সামনে আনেন আরেকটি আবেগময় ঘটনার কথা। সিনেমায় পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ার একটি বিশেষ দৃশ্য ছিলো। সেই দৃশ্যে যথারীতি পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ার শটও নেন সোহেল রানা কিন্তু কাঁটাগুল্মযুক্ত ওই পাহাড়ে গড়িয়ে পরার সময় বেশ আহত হন তিনি। সেসময় নায়িকা বসা ছিলেন একটি গাড়িতে, সোহেল রানাকে আহত দেখে দৌড়ে আসেন তার কাছে, এসেই নিজে থেকে তার সেবা করা শুরু করেন। এই মমতাভরা যত্ন সোহেল রানার মনে তার প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে। একইসাথে সোহেল রানাও বুঝতে পারেন নায়িকারও তার প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এভাবেই কাটে তাদের প্রায় তিন মাসের শুটিং।
আজও জানিনা সে কোথায় আছে
নায়িকা যেদিন চলে যাবেন সেদিন এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে গিয়েই সোহেল রানা টের পান মনের কোনে তিনি পুষেছেন সোমা মুখার্জীর জন্য অগাধ ভালোবাসা। সোহেল রানা বলেন, ‘এপার-ওপার সিনেমার কথা বলতে গেলেই আমার স্মৃতি অন্যরকম হয়ে পড়ে।‘ তিনি বলেন, ‘আই এম ইন …..কি বলবো, কোন শব্দ দিয়ে আমি এটাকে বুঝাতে পারবো না, কারণ সাধারণ যেসব শব্দ দিয়ে এসব বোঝানো হয় তার সাথে আমি একমত না। প্রেম যদি বলো তাহলে আজ ৫০ বছর পর আজও আমি জানিনা সে কোথায় আছে কেমন আছে কিভাবে আছে। সেও জানেনা আমি কোথায় আছি কিভাবে আছি।’
তবে এই ৫০ বছর পরে সোহেল রানা তাকে একবার স্থিরচিত্রের মাধ্যমে দেখেছেন বলেও জানান।
সোহেল রানার সাথে নায়িকা আর যোগাযোগ করেননি কেন জানতে চাইলে তিনি জানান, সোমা চেয়েছিলো তার পরিবারকে একটি স্থায়ী ও উন্নত অবস্থায় প্রতিষ্ঠা করে তারপর ফিরে আসবে কিন্তু সেই উন্নত জীবন তিনি তার পরিবারের জন্য প্রতিষ্ঠা করে দিতে পারেননি, যার কারণে নায়িকা আর তার সাথে যোগাযোগ রাখেনি।

সোহেল রানা জানান তিনি সোমাকে ওরা ১১ জন সিনেমার আয়ের টাকাও ধার দিতে চেয়েছেন কিন্তু সেই প্রস্তাব নায়িকা গ্রহণ করেননি। তিনি চেয়েছিলেন তার টাকাতেই তার পরিবারকে উন্নত জীবনে ফেরাবেন কিন্তু তা আর করতে পারেননি বলেই যোগাযোগ রাখেননি নায়িকা।
৫০ বছর পরও কি ভুলতে পেরেছেন?
এই কিংবদন্তী নায়কের কাছে প্রশ্ন ছিলো তবে এটা কি প্রেম নাকি অন্যকিছু?
সোহেল রানা বলেন, ‘এটাকে আমি প্রেমও বলি না ভালোবাসাও বলি না তবে তার সাথে কাটানো সময়গুলো আমি পরবর্তী ৫০ বছরেও আর ভুলতে পারিনি। দুনিয়ার অনেক আমি ভুলে গেছি তবে ওকে ভুলাটা হয়ে ওঠেনি এবং হবেও না।“
সোমা মুখার্জী ১৯৭৪ সালে তরুণ মজুমদারের ‘ফুলেশ্বরী’ সিনেমায় প্রথম অভিনয় করেন। এরপর এপার-ওপার সিনেমায় অভিনয় করেন।
