‘দ্য প্রাইস অব এ ভোট’
রবিবার (১৩ এপ্রিল) হাঙ্গেরির জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটির চরম ডানপন্থী নেতা ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটলো। অরবানকে অনেকেই বিবেচনা করেন সোভিয়েত-পরবর্তী পূর্ব ইউরোপের অন্যতম বৈষম্যমূলক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা হিসেবে। তবে তাঁর ও তাঁর দলের এই শোচনীয় পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে একটি অনুসন্ধানমূলক প্রামাণ্যচিত্র। বলা যায়, একটি প্রামাণ্যচিত্র হাঙ্গেরির ১৬ বছরের অপশাসনের অবসান ঘটালো যা কিনা ভোটের মাঠে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। দ্য হলিউড রিপোর্টার অবলম্বনে।
হাঙ্গেরির ২০২৬ সালের এই সংসদীয় নির্বাচনে পিটার মাগিয়ারের মধ্য-ডানপন্থী দল ‘টিসা’ (Tisza) অরবানের ‘ফিদেস’ (Fidesz) দলকে প্রায় তিন-এক ব্যবধানে পরাজিত করেছে। এত বছর ধরে জেরিম্যান্ডারিং (জেরিম্যান্ডারিং হলো নির্বাচনী এলাকার সীমানা এমনভাবে নির্ধারণ করার একটি পদ্ধতি, যা কোনো একটি রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে অন্যদের তুলনায় অন্যায্য সুবিধা প্রদান করে), বিচারব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার এবং স্বাধীন গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনার মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক কৌশলে ক্ষমতা সুসংহত করার পর এটি ছিল এক বিস্ময়কর পালাবদল। ১৯৯টির মধ্যে টিসা ১৩৫টি আসন জয় করে অন্যদিকে ফিদেস পায় মাত্র ৫৫টি আসন। ফলে টিসা এখন সাংবিধানিক পরিবর্তন আনার মতো সুপারমেজরিটি অর্জন করেছে।
‘দ্য প্রাইস অব এ ভোট’ ডকুমেন্টারি
সদ্য হেরে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের পরাজয়ের পেছনে নানা কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতির কারণে ইউরোপের অন্যতম দুর্বল অর্থনীতি হয়ে উঠা এবং ক্ষমতাসীন দলের উসকানিমূলক রাজনীতিতে জনসাধারণের ব্যাপক ভোগান্তি।
তবে তাঁদের হেরে যাওয়ার পেছনে অন্যতম গোপন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ‘দ্য প্রাইস অব এ ভোট’ ডকুমেন্টারি। নির্বাচন হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে প্রকাশিত এই স্বাধীন প্রামাণ্যচিত্রই বদলে দিয়েছে সব কিছু।

প্রায় এক ঘণ্টার এই’ ডকুমেন্টারিটি নির্মাণগত দিক থেকে খুব ঝকঝকে না হলেও অনুসন্ধানী শক্তিতে তা পরিপূর্ণ ছিলো। নির্মাতারা দেশের গ্রামীণ অঞ্চলের রোমা গ্রামগুলোতে-যেগুলো ফিদেসের শক্ত ঘাঁটি-ঘুরে বেড়িয়ে ঘুষ ও ভয়ভীতির এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের চিত্র তুলে ধরেন।
একাধিক হুইসেলব্লোয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, বুদাপেস্টভিত্তিক একটি সুসংগঠিত চক্র ফিদেসকে ভোট দিলে খাবারের প্যাকেট থেকে শুরু করে ২০,০০০ ফরিন্ট (প্রায় ৭৫ ডলার) পর্যন্ত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তা বাস্তবায়নও করে। তারা ভোটারদের সঙ্গে করে ভোটকেন্দ্রে যায় এবং একটি আইনি ফাঁক ব্যবহার করে বুথে ঢুকে নিশ্চিত করে যে ভোটাররা ফিদেসকেই ভোট দিচ্ছে। (চলচ্চিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্য দলগুলিও এ ধরনের চেষ্টা করেছে, তবে এত ব্যাপক বা কৌশলীভাবে নয়।)
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে, ডকুমেন্টারিটির অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারপন্থী মেয়ররা প্রায়ই আরও এক ধাপ এগিয়ে- সরকারি কর্মচারীসহ অনেককে অরবানের দলকে ভোট দিতে হুমকিও দিয়েছেন এমন তথ্য উঠে এসেছে।
একজন হুইসেলব্লোয়ার, যিনি আগে দলটির পক্ষে ঘুষ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কাজ করতেন, বলেন: “আপনি সরকারি কাজ পাবেন না, কাজে যেতে পারবেন না, এটা করতে পারবেন না, ওটা পাবেন না-তারা আপনার বাসাভাতা কেড়ে নেবে।”
আরেকজন হুইসেলব্লোয়ার যোগ করেন, “এই পরিবারগুলোর ক্ষতি করার জন্য তাদের হাতে অনেক উপায় আছে।” এর মধ্যে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপগুলোর একটি হলো-শিশুদের অপহরণের হুমকি দেওয়া।
এই চিত্রগুলোই ব্যাখ্যা করে কেন অরবান এতদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছিলেন। আর এসব বিষয়ের প্রকাশ, বিশেষ করে নির্বাচনের ঠিক আগে, তার ক্ষমতার অবসান নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
২২ লাখ ভিউ
‘দ্য প্রাইস অব এ ভোট’ ডকুমেন্টারিটি গত সপ্তাহে বুদাপেস্টের একটি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয় এবং একই সঙ্গে ইউটিউবেও প্রকাশ করা হয়। এই দুটি প্ল্যাটফর্ম চতুরতার সঙ্গে অরবানের প্রায় রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমকে পাশ কাটিয়ে প্রকাশিত হয়। মাত্র দুই সপ্তাহেই ডকুমেন্টারিটি ইউটিউবে ২২ লাখ ভিউ অর্জন করে।
যদিও এই প্রামাণ্যচিত্রটি সেই দুষ্কৃতী নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পেরেছে এমন বলা যায় না তবু এটি অনেক মানুষকে অরবানের বিরুদ্ধে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে, যারা অন্যথায় ভোট দিতে যেতেন না। রবিবার হাঙ্গেরিতে ভোটার উপস্থিতি সর্বোচ্চ ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। প্রায় ৬০ লাখ মানুষ ভোট দিতে এসেছেন যা ইঙ্গিত করে যে মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই প্রামাণ্যচিত্রটি দেখেছে। (এ ধরনের হার যুক্তরাষ্ট্রে হলে ৫ কোটিরও বেশি মানুষের সমান হতো।)
২০ জনের একটি দল
প্রামাণ্যচিত্রটি পরিচালনা করেছে প্রায় ২০ জনের একটি দল, যারা নিজেদের ‘ডেয়াকসিও কোজোসেগ’ (অর্থাৎ “কমিউনিটি কাউন্টার-অ্যাকশন”) নামে পরিচয় দেয়। তাদের ইউটিউব চ্যানেলে দলটি জানায়, “ছয় মাস আগে যখন আমরা শুটিং শুরু করি, তখন আমাদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল ভোট কেনাবেচা নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা। আমরা ১৪টি কাউন্টি থেকে তথ্য পেয়েছি, ৬০টিরও বেশি সাক্ষাৎকার নিয়েছি এবং ২০,০০০ কিলোমিটার ভ্রমণ করেছি। আমাদের সাক্ষাৎকারদাতাদের মতে, গ্রামীণ এলাকার মানুষের জীবন ও ভোট শুধু অর্থ দিয়ে নয়, মাদক এবং ভয়ভীতির মাধ্যমেও প্রভাবিত করা হয়।”
ট্রাম্প ভিক্টরকে ভালোবাসেন
অরবানের পরাজয় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও একটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা দীর্ঘদিন ধরেই হাঙ্গেরির এই অতিপপুলিস্ট নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিল। গত সপ্তাহে, অরবানের জয়ের সম্ভাবনা কমতে থাকায়, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স হাঙ্গেরি সফর করে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। তিনি অরবানের সেই বক্তব্যই পুনরাবৃত্তি করেন যে হাঙ্গেরির অর্থনীতি ধ্বংসের জন্য ফিদেস নয়, বরং ইউরোপীয় ইউনিয়ন দায়ী। ভ্যান্স যখন ফিদেসের এক সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প ফোনে যুক্ত হয়ে জনতাকে বলেন, “আমি ভিক্টরকে ভালোবাসি… তিনি একজন অসাধারণ মানুষ।”

অরবানের এই পরাজয় এবং ‘দ্য প্রাইস অব এ ভোট’ প্রামাণ্যচিত্রের সম্ভাব্য প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও নির্বাচনের গতিপথ বদলাতে প্রামাণ্যচিত্র ব্যবহারের প্রচেষ্টার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে রক্ষণশীলদের পরাজিত করার উদ্দেশ্যে। এই ধরনের প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল মাইকেল মুরের Fahrenheit 9/11 দিয়ে, যা ২০০৪ সালে জর্জ ডব্লিউ. বুশের পুনর্নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল। একইভাবে, ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় এররল মরিসের অভিবাসনভিত্তিক অ্যান্টি-ট্রাম্প প্রামাণ্যচিত্র Separated মুক্তি পায়।
তবে ট্রাম্প ও বুশ-দুজনেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে জয়ী হন, এমনকি মুরের চলচ্চিত্রের বিপুল জনপ্রিয়তার পরও বুশ পরাজিত হননি। কিন্তু রবিবার হাঙ্গেরিতে একটি প্রামাণ্যচিত্র এমন কিছু করে দেখাল, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চলচ্চিত্র কখনোই করতে পারেনি।


