ঈদুল ফিতর হোক, কিংবা ঈদুল আজহা- স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে ঈদের আনন্দে যেন অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে টেলিভিশনে প্রচারিত ঈদ অনুষ্ঠানমালা। কোরবানির ঈদে আল্লাহর নামে কোরবানির সকল আনুষাঙ্গিকতা শেষ করে যখন একটু ফুরসত, তখনই হাতে টিভির রিমোট তুলে নেন বিনোদনপ্রেমীরা। পরিবার নিয়ে ঈদের বিশেষ বিশেষ আয়োজন উপভোগ না করলে যেন এই বিশেষ দিনটি পূর্ণতাই পায় না!
আশি-নব্বইয়ের দশকে ফিরে তাকালে, তখন একমাত্র বিটিভি কেন্দ্রিক ঈদ বিনোদন থাকলেও ছোটপর্দার সেই আয়োজনগুলোই দর্শকদের কাছে ছিল একদম জাদুর খেলা। সেই জাদুতে দর্শকরা এতোই মন্ত্রমুগ্ধ যে সেই রেশ কাটানো সম্ভব হয়নি এখনও। ‘নাইন্টিজ কিড’-রা তো বটেই, ইন্টারনেটের কল্যাণে ‘জেন-জি’-রাও অকপটেই মুগ্ধ হয়ে যায় সেই জাদুতে। এখনকার যুগের অসংখ্য টিভি চ্যানেল মিলে কোটি টাকার বাজেট নিয়েও ছুঁতে পারেনি এ মাইলফলক। অন্তত এমনই ভাবনা অনেকের।
আগে বিটিভি’র ঈদ আয়োজনে খুব বেশী কিছু কি ছিল? প্রথমেই বলতে হয় কিংবদন্তি আমজাদ হোসেনের নাটকের কথা।
আশি- নব্বইয়ের দশকে বিটিভির নাটকগুলো ছিল অসাধারণ। সপ্তাহে একটি ধারাবাহিক, একটি সাপ্তাহিক নাটক প্রচার হতো, যা পরিবারের সবাই মিলে একসাথে বসে দেখা হতো। আর ঈদ এলে সবাই মুখিয়ে থাকতেন কিংবদন্তি বাংলাদেশি অভিনেতা, লেখক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেনের নাটক দেখবে বলে।
আশির দশকে মূলত ঈদের দিন সন্ধ্যা হলেই শহর–গ্রামের রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত! ঐ সময় রাস্তায় বের হলে মনে হতো যেন কারফিউ চলছে। কিন্তু আসলে সবাই তখন স্থির হয়ে বসে থাকতেন টেলিভিশনের সামনে। তারা অপেক্ষায় থাকতেন ঈদের নাটক ‘জব্বর আলী’ দেখার জন্য।
‘জব্বর আলী’ নাটকটি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঈদ অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে প্রথম প্রচারিত হয়। নাটকের নাম ভূমিকায় অভিনয় করতেন আমজাদ হোসেন। নাটকটির পরিচালকও ছিলেন তিনি। ‘জব্বর আলী’ এতই জনপ্রিয় ছিল যে ‘টেকা দ্যান দুবাই যামু’, ‘জবা কুসুম রোকন দুলালের মা’–এর মতো নাটকের সংলাপগুলো দর্শকদের মুখে মুখে ঘুরতো।
আমজাদ হোসেনের পর যে মানুষটি ঈদে দর্শকদের আনন্দের খোরাক জুগিয়েছেন, তিনি হলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। ‘জব্বর আলী’-র মত দর্শকপ্রিয় নাটকের পর হুমায়ূন আহমেদের নাটকই দর্শকদের মাঝে ঈদের আমেজ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তেমনই একটি নাটক ছিল ‘পক্ষীরাজ’।
‘পক্ষীরাজ’ নাটকে অভিনয় করেন তিনজন কালজয়ী অভিনেতা। তারা হলেন- ফারুক আহমেদ, এজাজুল ইসলাম ও স্বাধীন খসরু। নাটকটিতে এই তিন অভিনেতার রসায়ন হুমায়ূন আহমেদের এতই পছন্দ হয় যে, তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই তিনজনকে নিয়ে একটি নাটক বানাবেন। যেমন চিন্তা তেমন কাজ- পরের ঈদের জন্য তিনি নির্মাণ করেন ‘তারা তিনজন’। এ নাটকটি প্রথম প্রচারিত হয়েছিল ২০০০ সালের এক ঈদে।
পরবর্তীতে দর্শক চাহিদার কথা বিবেচনা করে তৈরি করা হয় ‘তারা তিনজন’ নাটকের কয়েকটি সিকুয়েল। ‘তারা তিনজন টি-মাস্টার’, ‘তারা তিনজন ঝামেলায়’, ’তারা তিনজন হে পৃথিবী বিদায়’-সহ এই সিরিজের ১১টি নাটক প্রচারিত হয়। সবগুলোই ছিল উৎসবভিত্তিক অনুষ্ঠানমালার আওতাভুক্ত। এদিকে ফারুক- এজাজুল- খসরু- এই তিন জনের চরিত্র হয়ে উঠে অল টাইম সুপার হিট।
‘তারা তিনজন’ সিরিজের দর্শকপ্রিয় তিন চরিত্রের পর একবিংশ শতাব্দীতে প্রচারিত নাটকের যে দুটি চরিত্রের কথা না বললেই নয়, সেই দুটি চরিত্র হলো- ‘আরমান ভাই’ ও ‘সিকান্দার বক্স’। কি বন্ধুরা, কিছু মনে পড়ছে?
২০০৮ সালের কথা। যে সালে ‘আরমান ভাই’ হয়ে প্রথমবারের মত পর্দায় দেখা দিয়েছিলেন অভিনেতা জাহিদ হাসান। পান চিবিয়ে চিবিয়ে ঢাকাইয়া ভাষায় আরমান ভাইয়ের দাদাগিরি করা, কিংবা রংচঙা পাঞ্জাবি পরে চোখে সুরমা লাগিয়ে হাস্যরসাত্মক বিভিন্ন কার্যকলাপ করা- দর্শকরা সবই সানন্দে গ্রহণ করেন। ফলে টানা চার বছর ঈদ অনুষ্ঠানমালায় একের পর এক আরমান ভাই সিরিজের নাটক আসতে থাকে। এটি প্রচারিত হতো বেসরকারি টিভি চ্যানেল বাংলাভিশনে।
অপরদিকে ২০১৪ সাল থেকে ‘সিকান্দার বক্স’ হয়ে ঈদে নিয়মিত দেখা দিয়েছেন দাপুটে অভিনেতা মোশাররফ করিম। এতে তিনি এতটাই সাবলীলভাবে অভিনয় করেছেন প্রথম পর্ব প্রচারের পর থেকেই ‘সিকান্দার বক্স’ দর্শকদের মনে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। এমনকি এ নাটক দেখে দর্শকদের মুখে মুখে চলে আসে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার সংলাপগুলো। যেমন- আমি কিতা করাম, কেয়েছি, আবেগে কাইন্দালাছি, আমার এত আবেগ ক্যারে ইত্যাদি। উৎসবভিত্তিক নাটক হিসেবে একটানা কয়েক বছর চলার পর ‘সিকান্দার বক্স’ শেষ করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
নাটকের অধ্যায় শেষ করে, এবার যদি আসা যাক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের দিকে। আর ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের নাম নিলেই আবারও ফিরে যেতে হয় বিটিভির পর্দায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় যে অনুষ্ঠান দুটি এখন অবধি টিকিয়ে রেখেছে নিজস্ব ফ্যানবেজ, তা হলো- ‘আনন্দমেলা’ এবং ‘ইত্যাদি’।
বাংলাদেশে ‘ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান’ নামক ধারাটি শুরু হয় ‘আনন্দমেলা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই। যা বিটিভির পর্দায় প্রথম প্রচারিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। ঈদ উপলক্ষে এই বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানটি তৈরি করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রথম ৫ বছরে এ অনুষ্ঠানের ১০টি পর্ব প্রচারিত হয়, যার আটটিই করেছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। পরবর্তীতে অন্য অনেকে এটি উপস্থাপনা করে চলেছেন। বিটিভি এটিকে ঈদের মূল অনুষ্ঠান হিসেবেই প্রচার করে থাকে। ২০২৪ সালে এসেও ‘আনন্দমেলা’ দর্শকদের মাঝে আনন্দ ছড়িয়েই যাচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশের সব বয়সী দর্শকদেরই পছন্দের তালিকায় স্থায়ী জায়গা করে নিয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে সগৌরবে প্রচারিত হয়ে আসছে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। হানিফ সংকেতের নির্মিত ও উপস্থাপিত এ অনুষ্ঠানটি প্রথমে পাক্ষিক, পরে মাসিক এবং এখন ত্রৈমাসিকভাবে প্রচারিত হয়। তবে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ পর্বের আয়োজন করা হয়। আর দর্শকদের মাঝে এই বিশেষ পর্বের ক্রেজ অন্য মাত্রার। প্রতি বছর ঈদ-উল-ফিতরের পরদিন রাত ১০ টার ইংরেজি সংবাদের পর সম্প্রচারিত হয় অনুষ্ঠানটি। সাধারণত ঈদুল আজহা উপলক্ষে কখনো ‘ইত্যাদি’ নির্মাণ করা না হলেও শিডিউল অনুযায়ী নিয়মিত নতুন পর্ব থাকলে ঈদুল আজহায়ও দর্শকরা উপভোগ করতে পারে ‘ইত্যাদি’।
টেলিভিশন দর্শকদের যেমন কৌতূহল থাকে ঈদের ‘ইত্যাদি’-তে এবার কী চমক থাকবে, আরও একটি অনুষ্ঠান আছে- যে অনুষ্ঠানে নতুন চমক দেখতে মুখিয়ে থাকে দর্শকরা। এ অনুষ্ঠানটি হলো- চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’। আরও আছে কেকা ফেরদৌসীর উপস্থাপনায় ‘পূরবী ঈদ আনন্দ’।
কয়েক বছর ধরে ঈদ উপলক্ষে নির্মাণ করা হয় ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’। প্রত্যন্ত এলাকার কৃষকদের নিয়ে নানা ধরনের খেলাধুলা করা হয় এবং সেই আনন্দ ভাগাভাগি করা হয় টেলিভিশন দর্শকদের সঙ্গে। কৃষি ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের পরিকল্পনা, পরিচালনা ও উপস্থাপনায় জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠানটি একেক ঈদে একেক এলাকার কৃষকদের নিয়ে আয়োজন করা হয়।
ঈদের অনুষ্ঠানমালায় চ্যানেল আইয়ের আরেকটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘পূরবী ঈদ আনন্দ’। অনন্যা রুমার প্রযোজনায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তারকাদের নিয়ে নির্মিত এই গেম শো উপস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন বিশিষ্ট টিভি ব্যক্তিত্ব কেকা ফেরদৌসী।
আনন্দে-ছন্দে, সুরে-গানে, কৌতুকে-ব্যঙ্গে প্রতি বছরই বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো মাতিয়ে রাখতে চেষ্টা করে আসছে তাদের দর্শকদের। যদিও এখনকার বেশির ভাগ দর্শকদেরই অভিযোগ- সেকাল থেকে চলে আসা হাতে গোনা কয়েকটি অনুষ্ঠান ছাড়া মানসম্মত অনুষ্ঠানের এখন বড়ই অভাব। বিশেষ করে নাটক। প্রতি ঈদেই তৈরি হয়ে আসছে অসংখ্য নাটক। তবে আমজাদ হোসেন কিংবা হুমায়ূন আহমেদের মত কিংবদন্তিদের নাটকের শৈল্পিক গুণাবলী এখনকার নাটকে পাওয়া মুশকিল।
দর্শকরা ফিরে পাক তাদের নস্টালজিয়ার জাদু, দর্শকদের প্রত্যেক ঈদ জমে উঠুক আনন্দে- বিনোদনে।
লেখা: রাহনামা হক