কখনো একটি আংটি খুলে দেয় অন্য জগতের দরজা। কখনো এক অচেনা বনে লুকিয়ে থাকে হাজারো রহস্য। আর কখনো এক জাদুকরী সিংহের হাত ধরে শুরু হয় এক নতুন পৃথিবীর গল্প। ছোটবেলায় এমন কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁদের জন্য আবারও আসছে নার্নিয়া।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন করে ফিরছে জনপ্রিয় ফ্যান্টাসি সিরিজ ‘দ্য ক্রনিকলস অব নার্নিয়া’। এবার এর গল্প নিয়ে পর্দায় আসছেন পরিচালক গ্রেটা গারউইগ। তাঁর নতুন সিনেমা ‘নার্নিয়া: দ্য ম্যাজিশিয়ানস নেফিউ’ এর প্রথম ট্রেলার প্রকাশ করেছে নেটফ্লিক্স। ট্রেলারে জাদুর আংটি, অচেনা জগত, রহস্যময় চরিত্র আর এক নতুন পৃথিবীর জন্মের ইঙ্গিত মিলেছে। সব মিলিয়ে, কল্পনার জগতে আবারও ডুবে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে দর্শকদের সামনে।
এক আংটি, দুই শিশু, আর নতুন এক জগৎ
সিনেমাটির গল্পের শুরু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ইংল্যান্ডে। দুই শিশু ডিগরি ও পলি হঠাৎ এমন এক জগতের সন্ধান পায়, যেখানে রয়েছে অন্য অনেক জগতে যাওয়ার দরজা। সেই জায়গার নাম ‘উড বিটুইন দ্য ওয়ার্ল্ডস’।

সেখানেই তাদের দেখা হয় জাদুকর অ্যান্ড্রু কেটারলির সঙ্গে। তাঁর দেওয়া জাদুর আংটি দুই শিশুকে নিয়ে যায় অদ্ভুত সব জায়গায়। আর এই যাত্রার মধ্যেই তারা দেখতে পায় নার্নিয়া নামের জাদুর রাজ্যের জন্ম।
কিন্তু নতুন একটি জগৎ তৈরি হওয়ার গল্প মানেই শুধু আনন্দ নয়। সেখানে রয়েছে রহস্য, বিপদ, ভালো-মন্দের লড়াই এবং অজানা অনেক প্রশ্ন। সিনেমাটি সেই জগতের শুরু কীভাবে হয়েছিল, তা তুলে ধরবে।
ট্রেলারে নজর কাড়ল ‘স্টেয়ারওয়ে টু হেভেন’
প্রথম ট্রেলারেই দর্শকদের জন্য বিশেষ চমক রেখেছেন গ্রেটা। এতে ব্যবহার করা হয়েছে বিখ্যাত রক ব্যান্ড লেড জেপেলিনের গান ‘স্টেয়ারওয়ে টু হেভেন’। গানের সঙ্গে জাদুর জগতের দৃশ্য গুলো সিনেমাটির আবহকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
ট্রেলারে জাদুকর অ্যান্ড্রু কেটারলি চরিত্রে ড্যানিয়েল ক্রেগকে দেখা যায়। শিশুদের হাতে জাদুর আংটি তুলে দেওয়ার সময় তাঁর কণ্ঠে শোনা যায়, কখনো কখনো একটি গল্পই অন্য সব গল্পের শুরু।

এ ছাড়া দেখা গেছে জাডিসকে, যিনি ভবিষ্যতে হোয়াইট উইচ নামে পরিচিত হবেন। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন এমা ম্যাকি। আর নার্নিয়ার পরিচিত জাদুকরী সিংহ আসলানের কণ্ঠ দিয়েছেন মেরিল স্ট্রিপ। ট্রেলারে পুরো গল্প প্রকাশ করা হয়নি। তবে কয়েকটি দৃশ্যই বুঝিয়ে দেয়, এই সিনেমায় জাদু, অভিযান ও আবেগ একসঙ্গে থাকবে।
বইয়ের গল্প থেকে সিনেমার জাদু
‘দ্য ম্যাজিশিয়ানস নেফিউ’ মূলত ব্রিটিশ লেখক সি এস লুইসের লেখা ‘দ্য ক্রনিকলস অব নার্নিয়া’ সিরিজের একটি বই। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। এটি নার্নিয়া সিরিজের প্রথম দিকের গল্প নয় শুধু, বরং ঘটনাক্রম অনুযায়ী পুরো জাদুর জগতের শুরুর গল্প। এই সিরিজের বই গুলোতে কথা বলা প্রাণী, জাদুর রাজ্য, সাহসী শিশু এবং ভালো-মন্দের লড়াইয়ের গল্প রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাঠকেরা এসব গল্প পড়ে বড় হয়েছেন।
এর আগে নার্নিয়ার গল্প নিয়ে সিনেমাও তৈরি হয়েছে। ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ক্রনিকলস অব নার্নিয়া: দ্য লায়ন, দ্য উইচ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ডরোব’ বড় পর্দায় এই জগতকে নতুন করে পরিচিত করে। এরপর সিরিজটির আরও দুটি সিনেমা মুক্তি পায়, ‘প্রিন্স ক্যাসপিয়ান’ (২০০৮) এবং ‘দ্য ভয়েজ অব দ্য ডন ট্রেডার’ (২০১০)।
এবারের সিনেমাটি আগের গল্প গুলোর মতো একই জায়গা থেকে শুরু হচ্ছে না। বরং নার্নিয়া কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই শুরুর গল্প সামনে আনছে। তাই পুরোনো ভক্তদের কাছে এটি পরিচিত জগতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ, আর নতুন দর্শকদের কাছে একেবারে শুরু থেকে নার্নিয়াকে চেনার পথ।
যাদের নিয়ে নার্নিয়া
সিনেমাটির পরিচালক গ্রেটা গারউইগ। ‘লেডি বার্ড’ ‘লিটল উইমেন’ এবং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ‘বার্বি’ সিনেমার জন্য তিনি পরিচিত। ‘বার্বি’র পর এটিই তাঁর পরবর্তী সিনেমা। ড্যানিয়েল ক্রেগ অভিনয় করছেন জাদুকর অ্যান্ড্রু কেটারলি চরিত্রে। ডিগরি ও পলি চরিত্রে দেখা যাবে নতুন দুই মুখ ডেভিড ম্যাককেনা ও বিট্রিস ক্যাম্পবেলকে। এমা ম্যাকি হচ্ছেন জাডিস, আর মেরিল স্ট্রিপ কণ্ঠ দিচ্ছেন আসলানকে। সিনেমাটিতে আরও রয়েছেন ক্যারি মুলিগান।

বড় তারকার পাশাপাশি নতুন দুই শিশুশিল্পীকে কেন্দ্র করে এগোবে গল্প। ফলে পরিচিত মুখের অভিনয়ের সঙ্গে নতুন চরিত্রগুলোকেও আবিষ্কার করার সুযোগ পাবেন দর্শকেরা।
কবে খুলবে নার্নিয়ার জাদুর দরজা?
নেটফ্লিক্সের ঘোষণা অনুযায়ী, ‘নার্নিয়া: দ্য ম্যাজিশিয়ানস নেফিউ’ প্রথমে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৭। এরপর ২ এপ্রিল থেকে এটি নেটফ্লিক্সে দেখা যাবে। সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে আট সপ্তাহ ধরে দেখানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। নেটফ্লিক্সের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আসবে।
গ্রেটা গারউইগ জানিয়েছেন, তিনি বড় পর্দার জন্য সিনেমা বানাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাই নার্নিয়ার মতো বিশাল জগতের গল্পকে বড় পর্দায় তুলে ধরার বিষয়টি তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যান্টাসি সিনেমার আকর্ষণ শুধু জাদু বা অদ্ভুত প্রাণীতে সীমাবদ্ধ নয়। এমন গল্প দর্শককে বাস্তব জীবনের বাইরে নতুন একটি জগতে নিয়ে যায়। সেখানে অসম্ভবও সম্ভব হয়, ছোট চরিত্রও বড় পরিবর্তন আনতে পারে, আর একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ অভিযানের শুরু।
তবে সিনেমাটি দর্শকদের কতটা মুগ্ধ করবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে মুক্তি পর্যন্ত। আপাতত ট্রেলারই খুলে দিয়েছে সেই জাদুর দরজা। হয়তো আবারও দর্শকেরা মনে মনে প্রশ্ন করবেন, একটি আংটি যদি সত্যিই অন্য জগতে যাওয়ার পথ খুলে দিত, তবে তাঁরা কোথায় যেতে চাইতেন? নার্নিয়ার নতুন গল্প সেই কল্পনাকেই আবার জাগিয়ে তুলতে আসছে।









